Tuesday, August 26, 2014

পুরোনো তিন জাহাজ কিনতে পদে পদে অনিয়ম:প্রথম অালো

দরপত্র আহ্বানের পর কোম্পানি খোলা হয়েছে। তার পরই চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় ৫০ কোটি টাকার তিনটি পুরোনো জাহাজ সরবরাহের কাজ পেয়ে যায় তারা। আর অনভিজ্ঞ এই প্রতিষ্ঠানটি এভাবে প্রথমবারের মতো কাজ পেয়েই মুনাফা করেছে প্রায় ১৪ কোটি টাকা। সৌভাগ্যবান কোম্পানিটি হলো ঢাকার দিলকুশার বেঙ্গল লয়েড লিমিটেড। বুড়িগঙ্গার তীরে নতুন চালু হওয়া পানগাঁও নৌ টার্মিনালে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনার পরিবহন শুরু করতে প্রথমব
ারের মতো পুরোনো জাহাজ কিনেছে বন্দর। আর এই দরপত্র-প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে জাহাজ খালাস নেওয়া পর্যন্ত ধাপে ধাপে আইন ভেঙেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এমনকি শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই জাহাজগুলো খালাসও করা হয়েছে। এ নিয়ে যোগাযোগ করা হলে কাস্টমস কমিশনার মাসুদ সাদিক প্রথম আলোকে বলেন, শুল্ক-কর পরিশোধ না করে জাহাজ খালাস করা আইনগতভাবে ঠিক হয়নি বন্দরের। বন্দর সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-পানগাঁও নৌপথে কনটেইনার আনা-নেওয়ার জন্য তিনটি পুরোনো জাহাজ কিনতে ২০১২ সালের ২৯ নভেম্বর আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্র আহ্বানের প্রায় এক মাস পর, ৩ জানুয়ারি ট্রেড লাইসেন্স নেয় বেঙ্গল লয়েড লিমিটেড। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে ‘শিপিং লাইনস ও সরবরাহকারী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠানকে এই লাইসেন্স দেওয়া হয়। লাইসেন্সের নথিতে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান দেখানো হয় জিয়াউল হাসান চিশতীকে। অনভিজ্ঞ এই প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিয়ে যোগ্য হিসেবে নির্বাচিত হয়। অথচ দরপত্রে শর্ত ছিল, দরপত্রে অংশগ্রহণকারীর জাহাজ বা জলযান সরবরাহ বা এ-সংক্রান্ত কাজে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এ ছাড়া সুনির্দিষ্টভাবে জাহাজ নির্মাণ বা বেচাকেনা বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তিন বছরের অভিজ্ঞতা, পাঁচ বছরের মধ্যে ন্যূনতম ১০ কোটি টাকার একটি কাজ এবং এ সময়ে পণ্য সরবরাহের মোট মূল্য চার মিলিয়ন ডলার হতে হবে। অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান কীভাবে যোগ্য হিসেবে নির্বাচিত হলো—জানতে চাইলে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির আহ্বায়ক বন্দরের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমোডর এম শাহজাহান প্রথম আলোকে বলেন, বেঙ্গল লয়েড নতুন হলেও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউনি বেঙ্গল লিমিটেডের অভিজ্ঞতা ছিল। পুরোনো জাহাজ সরবরাহে তাদের সক্ষমতা বিবেচনা করেই যোগ্য নির্বাচিত করা হয়েছে। তবে চুক্তিপত্রে দেখা যায়, শুধু বেঙ্গল লয়েড লিমিটেডের সঙ্গে বন্দরের চুক্তি হয়েছে। অন্য কোনো সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বেঙ্গল লয়েডের সংযুক্ত থাকার বিষয়টি চুক্তিপত্রে উল্লেখ ছিল না। এ বিষয়ে বেঙ্গল লয়েড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলমগীর এ সর্দারের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ফোন ধরেন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক আফিকুন নবী। ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেশে নেই—এ কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের অন্য তিনটি কোম্পানির জাহাজ সরবরাহের পৃথক অভিজ্ঞতা ছিল। বন্দরকে প্রস্তাব দেওয়ার পর তারা বলেছে কোম্পানি গঠন করে দরপত্রে অংশ নিতে।’ আয় ১৪ কোটি: বন্দর সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর এই তিনটি জাহাজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে কিনেছে ৪৯ কোটি ৮৫ লাখ ১০ হাজার টাকায়। প্রতিটি জাহাজের গড়ে দাম ১৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা। প্রথম দুটি জাহাজের নথিপত্রে দেখা যায়, প্রতিটি জাহাজ আমদানি হয়েছে ১৫ লাখ মার্কিন ডলারে বা ১১ কোটি ৮৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকায়। এর অর্থ দুটি জাহাজ সরবরাহ দিয়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে প্রায় সাড়ে নয় কোটি টাকা। তৃতীয় জাহাজসহ আয় দাঁড়াচ্ছে অন্তত ১৪ কোটি টাকা। বেঙ্গল লয়েডের ব্যবস্থাপক আফিকুন নবী এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাহাজ ভেরিফিকেশনে আমাদের খরচ হয়েছে। বন্দর কর্মকর্তাদের দুবার প্রাক্-জাহাজীকরণ পরিদর্শনের খরচও আমরা বহন করেছি।’ তবে বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই খাতে খরচ খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। বন্দরের নামে ঋণপত্র খোলা হলেও তা পরিশোধ করেছে সরবরাহকারী। আর বন্দর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে স্থানীয় ঋণপত্রের মাধ্যমে বিল দিচ্ছে। এ পর্যন্ত বেঙ্গল লয়েডকে প্রায় ২৬ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে বন্দর। এর আগে স্থানীয় ঋণপত্রের মাধ্যমে বিল দেওয়ার নজির বন্দরে নেই। শুল্ক আইনের ব্যত্যয়: জাহাজ তিনটির মধ্যে প্রথম চালানে গত বছরের ২২ অক্টোবর চীন থেকে ‘এমভি পানগাঁও এক্সপ্রেস’ এবং ‘এমভি পানগাঁও সাকসেস’ জাহাজ দুটি বন্দরের জলসীমায় আনা হয়। মালয়েশিয়ার ফেয়ার সি শিপিং কোম্পানি থেকে জাহাজ দুটি কেনা হয়। আমদানির পর প্রথম চালানে আসা দুটি জাহাজের জন্য শুল্ক বিভাগ প্রাথমিকভাবে শুল্ক-কর নির্ধারণ করে প্রায় আট কোটি ৮২ লাখ টাকা। দ্বিতীয় চালানে গত ১৭ মার্চ ‘এমভি পানগাঁও ভিশন’ বন্দরে আসার পর কোনো নথিই শুল্ক বিভাগে জমা দেওয়া হয়নি। শুল্কায়নের আগেই এসব জাহাজে কনটেইনার পরিবহন কার্যক্রম শুরু করে দেয় বন্দর। নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের উপস্থিতিতে এসব জাহাজে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। এরপর শুরু হয় বাণিজ্যিক কার্যক্রম। অথচ শুল্ক আইন অনুযায়ী শুল্ক-কর পরিশোধের আগে এভাবে জাহাজ ব্যবহারের সুযোগ নেই। সাধারণত বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান এ ধরনের নিয়ম ভাঙলে পণ্য আটকসহ জরিমানার মাশুল আদায় করে নেয় শুল্ক বিভাগ। শুল্ক-কর আদায়ের জন্য গত ৮ জানুয়ারি কাস্টমস কমিশনার মাসুদ সাদিক চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যানের কাছে শুল্ক-কর পরিশোধের দাবিনামার নোটিশ দেন। সাত দিনের মধ্যে শুল্ক পরিশোধের নোটিশ দিলেও জবাব দেয়নি বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানাতে বলা হয় ওই নোটিশে। এ বিষয়ে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ নিজ কার্যালয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসব জাহাজের শুল্ক-কর মওকুফের জন্য আমরা আবেদন জানিয়েছিলাম রাজস্ব বোর্ডের কাছে। রাজস্ব বোর্ড জাহাজের শুল্ক-কর মওকুফ করবে বলে সম্মত হয়েছে। এ কারণে আমরা সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।’ তিনি আরও বলেন, পানগাঁও নৌ টার্মিনালে বন্দর অন্তত ৮০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ করছে। বন্দর কনটেইনার জাহাজ চালু না করলে নৌপথে কনটেইনার পরিবহন শুরু করা যায় না। এ কারণে দেশের স্বার্থে কনটেইনার পরিবহন শুরু করা হয়েছে। জানা গেছে, দরপত্রের দুটি শর্ত ছিল, বিদেশের বন্দর থেকে জাহাজীকরণের পর থেকে দায়দায়িত্ব বন্দরের। আবার দরপত্রের আরেকটি স্থানে শর্ত ছিল, সরবরাহকারীই শুল্ক-কর পরিশোধ করবে। এমন দ্বৈত শর্তের কারণে বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বন্দরই এই তিনটি জাহাজের শুল্ক-কর পরিশোধ করবে। এ জন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি বন্দরের নামেই জাহাজগুলো আমদানি করেছে। পুরোনো জাহাজ নিয়ে প্রশ্ন: জাহাজ কেনা বন্দরের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। বন্দর হলো পণ্যের জামিনদার। জাহাজ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (সমুদ্রগামী জাহাজের জন্য) এবং অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা রয়েছে। আবার সরকারিভাবে পুরোনো পণ্য কেনার নিয়মও নেই। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, বেসরকারি কোম্পানিগুলো জাহাজ সংগ্রহ না করায় দ্রুত পানগাঁও নৌ টার্মিনাল চালু করতে বাধ্য হয়েই বন্দর পুরোনো জাহাজ কিনেছে। এ জন্য মন্ত্রণালয় থেকে পুরোনো জাহাজ ক্রয় করার অনুমোদনও নেওয়া হয়েছে। নথিতে দেখা যায়, এমভি পানগাঁও এক্সপ্রেস এবং পানগাঁও সাকসেস জাহাজ দুটি তৈরি হয়েছে ২০০৪ সালে। আর এমভি পানগাঁও ভিশন জাহাজটি তৈরি করা ২০০১ সালে। অথচ দেশীয় জাহাজ নির্মাণশিল্পগুলোতে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, দেশে এখন আটটি রপ্তানিমুখী জাহাজ নির্মাণ কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠান ১১টি কনটেইনার জাহাজ তৈরি করছে। প্রতিটি নতুন জাহাজ তৈরিতে ব্যয় হচ্ছে ২৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা। এসব জাহাজের প্রতিটি ইঞ্জিনের ক্ষমতা ৭০০ থেকে ৮০০ কিলোওয়াট। অথচ বন্দরের সংগ্রহ করা জাহাজের ক্ষমতা ২১৮ কিলোওয়াট।

No comments:

Post a Comment