৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তি সামনে রেখে চলতি মাসেই কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছে বিএনপি। ৫ জানুয়ারি ঢাকায় বড় সমাবেশ অথবা সারা দেশে কয়েক মিনিটের জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে সরকারের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন বা সরকারকে ‘না’ বলার মতো কর্মসূচির চিন্তা করা হচ্ছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে তার আগে এই ডিসেম্বরেই ঢাকা থেকে খুলনা, সিলেট ও চট্টগ্রাম অভিমুখে তিনটি রোডমার্চ কর্মসূচি করার নীত
িগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। রোডমার্চের দিন-তারিখ এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা বলেন, নতুন সংসদ নির্বাচনের দাবিতে মার্চের মধ্যে আন্দোলনকে একটা চূড়ান্ত রূপ দিতে চায় দলটি। আন্দোলনের শুরুটা হবে ‘অহিংস’ ও ‘গণসংযোগমুখী’। তবে এতে বাধা এলে কর্মসূচির ধরন এবং আন্দোলনের চরিত্রও পাল্টাবে। এ ক্ষেত্রে ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের আগের মতো অর্থাৎ রাজধানী ঢাকাকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এসব কর্মসূচির বিষয়ে বিএনপির কোনো নেতা গণমাধ্যমে উদ্ধৃত হয়ে কথা বলতে রাজি হননি। স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, ৫ জানুয়ারি বড় কর্মসূচি হবে। তবে কী হবে তা তিনি খোলাসা করেননি। ২০-দলীয় জোটের একটি সূত্র জানায়, জোটের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা বিএনপির চেয়ারপারসনকে বলেছেন, সরকার ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ‘কলঙ্ক’ ভুলিয়ে দিতে প্রপাগান্ডার আশ্রয় নিতে পারে। এ অবস্থায় তিনি ৫ জানুয়ারি রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে এমন কিছু করার পরামর্শ দেন, যাতে ওই কর্মসূচিতে সরকারের প্রতি চরম অনাস্থা এবং ২০-দলের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থনের প্রকাশ ঘটে। বিএনপির কেন্দ্রীয় একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, রাস্তার চাপ, আন্তর্জাতিক চাপ ও নীরব জনমতের চাপ—এই তিন চাপের সমন্বয় হচ্ছে আন্দোলন। আন্তর্জাতিক চাপ ও নীরব জনমতের চাপ সৃষ্টির জন্য বিএনপি কাজ করে যাচ্ছে। আগামী বছরের শুরু থেকে রাজপথের চাপ তৈরির জন্য কর্মসূচি প্রণয়নের কাজ চলছে। দলীয় অপর একটি সূত্র জানায়, সফলতা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও জানুয়ারিতে সরকারকে একটি ধাক্কা দিতে চায় বিএনপি। এ জন্য আপাতত দল গোছানোর কার্যক্রমও স্থগিত রাখা হয়েছে। ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণার পর সংগঠনে বিদ্রোহ হয়েছে। এ কারণে যুবদলের কমিটি পুনর্গঠনও স্থগিত রাখা হয়েছে। ঢাকা মহানগর বিএনপির নতুন আহ্বায়ক কমিটি করা হলেও তারা সব ওয়ার্ড ও থানা কমিটি ঘোষণা করতে পারেনি। মহানগর কমিটি পুনর্গঠনের সঙ্গে যুক্ত একজন নেতা জানান, তাঁদের বেশির ভাগ কাজ শেষ পর্যায়ে। কৌশলগত কারণে এখনই কমিটি ঘোষণা করা হচ্ছে না। তাঁরা মনে করছেন, এখন কিছু দ্বন্দ্ব থাকলেও আন্দোলন শুরু হলে সে দ্বন্দ্ব থাকবে না। বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতা জানান, তাঁদের কাছে তথ্য আছে আগামী মার্চ মাসের মধ্যেই খালেদা জিয়াসহ বিএনপির কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা গ্রেপ্তার হতে পারেন। নেতাদের গ্রেপ্তারের পর পরই দল ভাঙার পরিকল্পনা নিয়ে এগোবে সরকার। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলা দুটির বিচার শেষ করার প্রক্রিয়া তারই অংশ বলে মনে করছেন বিএনপির নীতি-নির্ধারণী মহল। খালেদা জিয়াকে যেকোনো সময় গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রথম আলোকে বলেন, এরশাদের বিরুদ্ধে মামলা ঝুলছে ২০ বছর ধরে, কিছু হয় না। আর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা তাড়াতাড়ি শেষ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এতেই সরকারের মনোভাব বোঝা যায় যে তারা কী চায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ সরকার পারে না এমন কিছু নেই। তারা খালেদা জিয়াসহ বিএনপির নেতাদের নামে মামলা দিয়ে এখন ট্রায়ালে নিচ্ছে। এর মোটিভ হচ্ছে বিএনপিকে নির্বাচন এবং রাজনীতি থেকে দূরে রাখা।’ দলীয় সূত্রগুলো জানায়, খালেদা জিয়ার ‘গ্রেপ্তার’ বা গত বছরের ২৯ ডিসেম্বরের আগের মতো ‘গৃহবন্দীর’ মতো পরিস্থিতিতে পড়ার আগেই মাঠের আন্দোলনকে একটা পর্যায়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। তবে এই ঝটিকা আন্দোলনের রূপরেখা সম্পর্কে বিএনপির কেন্দ্রীয় বা মাঠপর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতারাও এখন পর্যন্ত পরিষ্কার নন। আন্দোলনের ছক বা কৌশল নির্ধারণের বিষয়টি বিএনপির চেয়ারপারসন দেখছেন। তিনি অল্প কয়েকজন নেতার সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ রেখেছেন। জোটের একটি সূত্র জানায়, ২০-দলীয় জোটের শরিক কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক একটি দলের নেতারা সম্প্রতি খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর গুলশানের কার্যালয়ে দেখা করেন। তখন খালেদা জিয়া দলটির নেতাদের শক্তভাবে আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিতে বলেন। এ সময় ধর্মভিত্তিক দলের একজন নেতা খালেদা জিয়াকে বলেন, আন্দোলনে নামার আগে কর্মীরা জানতে চান কোনো ‘সিগন্যাল’ আছে কি না। তাঁদের কী বলব? জবাবে খালেদা জিয়া হেসে বলেন, ‘আল্লাহর ওপর ভরসা করে নামেন।’ অবশ্য বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান মনে করেন, জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভ আছে, তাতে জনগণই আন্দোলনের পথ দেখাবে।
No comments:
Post a Comment