Tuesday, August 19, 2014

উভয় দলে বিভক্ত মহানগর:যুগান্তর

আ’লীগ উত্তর-দক্ষিণে মাহবুব হাসান ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগকে উত্তর-দক্ষিণে ভাগ করা নিয়ে নেতারাই বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। নেতৃত্ব প্রত্যাশীরা চাচ্ছেন মহানগর উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্তি। কিন্তু মহানগর আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা এই বিভক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তারা অখণ্ড মহানগর আওয়ামী লীগ চান। দু’পক্ষই দলের শীর্ষ মহলে জোর তদবির অব্যাহত রেখেছেন। তবে দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা সিটি কর্পো
রেশনকে দ্বিখণ্ডিত করার পর নগর আওয়ামী লীগকেও দুই ভাগে বিভক্ত করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া উত্তর-দক্ষিণে ভাগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। বিভক্তির বিপক্ষে অবস্থানকারীরা নগর নেতাদের সমর্থন আদায়ে তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে এর বিপরীতে অবস্থান নেয়ারা আছেন খোশমেজাজে। কারণ দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই বিভক্তির পক্ষে। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এমএ আজিজ এবং সাধারণ সম্পাদক ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রমসহ তাদের সমর্থক ও অনুসারীরা নগর ভাগের বিপক্ষে। ১২ আগস্ট ঘরোয়া এক আলোচনায় তারা নিজেদের অবস্থান সংহত করার বিষয়ে একমত হন। তারা দলীয় সভানেত্রীকে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগকে ভাগ না করার বিষয়ে তাদের অবস্থান জানাবেন। মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম রোববার যুগান্তরকে বলেন, তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের বিভক্তি চান না। এমনকি অন্য সিনিয়র নেতারাও বিভক্ত মহানগরের নেতৃত্ব নিতে ইচ্ছুক নন বলে জানান। তবে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা তাকে যে কোনো দায়িত্ব দিলে তা তিনি নিষ্ঠার সঙ্গেই পালন করবেন। নগরের আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাঈদ খোকনও মহানগর ভাগের বিপক্ষে। ১২ আগস্টের বৈঠকে মহানগর কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাঈদ খোকনের বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। মেয়র মোহাম্মদ হানিফপুত্রকে সুষ্ঠুভাবে সাংগঠনিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়ার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়। মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মুকুল চৌধুরী বলেন, এই মুহূর্তে নগরকে ভাগ করলে সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়বে। তিনি জানান, জামায়াত-বিএনপির আন্দোলন মোকাবেলায় রাজধানীতে শক্তিশালী সংগঠন প্রয়োজন। সবকিছু বিবেচনা করে দলীয় সভানেত্রী যে সিদ্ধান্ত নেবেন সে মোতাবেক কাজ করার জন্য তিনি প্রস্তুত আছেন বলে জানান। মহানগর ভাগের পক্ষেও আছে অনেক নেতা। তাদের মতে, দলের সভানেত্রী বুঝেই মহানগর কমিটি ভাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ঢাকা মহানগর আয়তনে বড় বলেই সিটি কর্পোরেশন দুই ভাগ করা হয়েছে। সেখানে উত্তর-দক্ষিণে দুটি কমিটি হলে দল দুর্বল হয়ে পড়বে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। এ প্রসঙ্গে শাহে আলম মুরাদ যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদ ও কাউন্সিলররা নগরের বিষয়ে দলীয় সভানেত্রীকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তিনি যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তারা সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক কাজ করবেন। হাজী মোহাম্মদ সেলিম যুগান্তরকে বলেন, এখন ঢাকা শহর অনেক বড়। তাই নগর কমিটি ভাগ করা দরকার। মহানগর আওয়ামী লীগের ভাগের পক্ষে রয়েছেন সহ-সভাপতি একেএম রহমতউল্লাহ, সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদার, যুগ্ম সম্পাদক ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিম, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, নগর নেতা হেদায়েতুল ইসলাম স্বপন, সংসদ সদস্য আসলামুল হক আসলাম ও ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা। তবে কিছুদিন আগেও বিভক্তির পক্ষে আসলামের জোরালো অবস্থান থাকলেও ইদানীং তা আর চোখে পড়ছে না। অন্যদিকে আজিজ, মায়া, কামরুলের সঙ্গে একমত সিনিয়র নেতা মুকুল চৌধুরী, ফয়েজ উদ্দিন মিয়া, বজলুর রহমান, আওলাদ হোসেন, সাঈদ খোকন, আবদুল হক সবুজ, ইসমত কাদির আকন্দ লাভলু প্রমুখ কমিটি ভাগের বিপক্ষে। এছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন থানার অনেক প্রভাবশালী নেতাও তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন। এদের মধ্যে রয়েছেন ডেমরার হারুনুর রশীদ মুন্না, মনিরুল ইসলাম মনু, শ্যামপুরের তোফাজ্জল হোসেন, ধানমণ্ডির মোর্শেদ কামাল, সূত্রাপুরের আবু নাসের মান্নাফি, মতিঝিলের আশরাফ তালুকদার, লালবাগের হুমায়ুন কবীর, বিমানবন্দরের মাসুমুল হক মাসুম প্রমুখ। বৃহত্তর উত্তরার সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক হাবিব হাসানও চান মহানগর অবিভক্ত থাকুক। বিএনপি আব্বাস-সোহেলে হাবিবুর রহমান খান ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মির্জা আব্বাস ও সদস্য সচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের দ্বন্দ্বের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে পুনর্গঠন কার্যক্রম। দুই নেতায় বিভক্ত মহানগর আহ্বায়ক কমিটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার চেয়ে নিজেদের গ্র“প ভারি করতেই ব্যস্ত। বারবার উদ্যোগ নিয়েও দলের হাইকমান্ড তাদের কোন্দল নিরসনে ব্যর্থ হন। প্রকাশ্যে বিরোধ না থাকলেও এখনও তাদের মধ্যে চলছে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। কোন্দলের কারণে এখন পর্যন্ত মহানগর কার্যালয়ে নিজ কক্ষে বসতে পারেননি সোহেল। ১ মাসের মধ্যে সব ওয়ার্ড ও থানা কমিটি এবং ২ মাসের মধ্যে মহানগরীর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ১৮ জুলাই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ১ মাস পেরিয়ে গেলেও একটি ওয়ার্ডেরও নতুন কমিটি গঠন করতে পারেনি তারা। দুই নেতার বিভক্তিতে বেঁধে দেয়া সময়সীমার মধ্যে মহানগর পুনর্গঠন হচ্ছে না বলে মনে করেন নেতাকর্মীরা। জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল বলেন, কমিটিতে কোনো গ্র“পিং নেই। তারা ঐক্যবদ্ধ আছেন। সময়সীমার ব্যাপারে তিনি বলেন, ঈদের আগে কমিটি ঘোষণা করা হয়। ঈদ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ১০ দিন কেটে যায়। ঈদের পরপরই পুরোদমে পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। থানা ও ওয়ার্ড কমিটি পুনর্গঠনে ইতিমধ্যে ১৫টি টিম গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা থানা ও ওয়ার্ড নেতাকর্মীদের সঙ্গে বসে কর্মপন্থা চূড়ান্ত করছেন। জানা গেছে, কমিটি ঘোষণার পর থেকেই শুরু হয় দ্বন্দ্ব। পুনর্গঠনের কৌশল নির্ধারণের চেয়ে একে অপরকে ঘায়েলের ছক তৈরিতে ব্যস্ত। সোহেলকে সদস্য সচিব হিসেবে মেনে নিতে পারেননি মির্জা আব্বাস। প্রকাশ্যেই তিনি সোহেলের বিরোধিতা শুরু করেন। এমনকি সোহেলকে সদস্য সচিব পদ থেকে সরিয়ে দেয়ারও চেষ্টা করেন আব্বাস অনুসারীরা। মহানগর বিএনপির কার্যালয়ে সদস্য সচিবের কক্ষে তালা লাগিয়ে দেন তারা। এ নিয়ে আব্বাস ও সোহেল অনুসারীদের মাঝে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। সূত্র জানায়, আব্বাস-সোহেলের দ্বন্দ্বে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতারা। দলের নীতি-নির্ধারকসহ মহানগর বিএনপির বড় একটি অংশ সোহেলের পক্ষ নেন। অনেকটা মুখোমুখি অবস্থানে চলে যান আব্বাস ও সোহেল। এ অবস্থায় চলতি মাসের শুরুতে মহানগর নেতাদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন খালেদা জিয়া। ওই সভায় আব্বাস-সোহেলসহ সিনিয়র নেতাদের সতর্ক করে দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, কেউ যদি দল পুনর্গঠনে বাধার সৃষ্টি করেন তা মেনে নেয়া হবে না। খালেদা জিয়ার এমন হুশিয়ারির পর প্রকাশ্যে আব্বাস-সোহেলের দ্বন্দ্ব থেমে যায়। শুরু হয় মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। যা এখনও চলছে। সবশেষ ১৬ আগস্ট কালো পতাকা মিছিল শেষে এর প্রতিফলন দেখা যায়। ওই দিন নয়াপল্টন থেকে মিছিল শুরু হয়ে মালিবাগে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলের সামনে ছিলেন মির্জা আব্বাস। মাঝখানে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে ছিলেন সোহেল। মিছিলের অগ্রভাগ মালিবাগে গিয়ে পৌঁছার পর মির্জা আব্বাস কর্মসূচি সমাপ্তি ঘোষণা করে চলে যান। এর কিছুক্ষণ পর সেখানে উপস্থিত হন মির্জা ফখরুল ও সোহেল। সোহেল এ সময় মাইক হাতে নিয়ে নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ জানান। কর্মসূচি সমাপ্ত ঘোষণা করতে ফখরুলের হাতে মাইক তুলে দেন। এক অনুষ্ঠান দুবার শেষ করার নজির সৃষ্টি করেন আব্বাস-সোহেল। বিষয়টি অনেকের মাঝে হাস্যরসেরও জন্ম দেয়। এদিকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে গঠিত ১৫টি টিম গঠন করা হলেও ঢিমেতালে চলছে তাদের কার্যক্রম। ১ সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনও কোনো ওয়ার্ডের কাউন্সিলের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করতে পারেনি। অভিযোগ রয়েছে, টিমের দায়িত্বপ্রাপ্তরা কমিটি গঠনের আগেই নিজের অনুসারীদের নিয়ে নিজ নিজ অফিসে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে করণীয় চূড়ান্ত করছেন। উদ্দেশ্য পকেট কমিটি বানানো। এমন খবরে থানা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাঝে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ। প্রতিটি থানায় দুটি গ্র“প মুখোমুখি অবস্থায় রয়েছে। কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি না করা হলে ভয়াবহ সংঘর্ষেরও আশংকা করছেন অনেকে। রোববার এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার পূর্বাভাসও দেখা দেয়। ওই দিন মোহাম্মদপুর-আদাবর থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত সালাউদ্দিন আহমেদ তার মতিঝিলের ব্যবসায়িক অফিসে নেতাকর্মীদের নিয়ে মতবিনিময় সভার আয়োজন করেন। কিন্তু ওই সভায় অনেককে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি এমন অভিযোগ এনে তা বাতিলের দাবি জানায় এক পক্ষ। এই নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। পরে সভা স্থগিত করা হয়। রাজধানীর প্রায় সব থানাতেই এ অবস্থা বিরাজ করছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সাঈদ খান খোকন যুগান্তরকে বলেন, সোহেলকে নিয়ে একটি অংশ আলাদা একটি গ্র“প দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। তাতে সফল হবে বলে মনে হয় না। কারণ সোহেলের তো মহানগরীতে আগের কোনো অবস্থান নেই। তিনি বলেন, প্রত্যেকটি ওয়ার্ড ও থানায় গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সব গ্র“পের সঙ্গে মতবিনিময় করে নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয়া উচিত। কেউ যদি তার নিজ অফিসে নেতাদের নিয়ে এসব সভা করেন তবে পকেট কমিটি বানানোর অভিযোগ উঠতে পারে।  

No comments:

Post a Comment