Sunday, July 6, 2014

কর্মসূচি না থাকলেও থেমে নেই রাজনৈতিক মামলা-গ্রেফতার:কালের কন্ঠ

কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকলেও থেমে নেই রাজনৈতিক মামলা ও গ্রেফতার। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গ্রেফতার করা হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের। পবিত্র রমজান মাসেও এমন হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা। উচ্চ আদালতে আগাম জামিন বন্ধ থাকায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অনেকে। বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেফতার বিষয়ে কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় একশ্রেণীর পুলিশও হয়ে পড়েছে বেপরোয়া। সুনির্দিষ্ট কোনো মামলা না থাকলে অনেক সময় ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করছে তারা। এরপর চালাচ্ছে গ্রেফতারবাণিজ্য। রাজনৈতিক নেতাকর্মীর পাশাপাশি এ ধারায় টার্গেট হচ্ছেন অনেক ব্যবসায়ী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা ঢালাও গ্রেফতার ও এ নিয়ে বাণিজ্যের জন্য সরকারকেই দায়ী করছেন। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর নেমে আসে চরম ক্র্যাকডাউন। নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় নির্দেশে যেসব এলাকায় নেতাকর্মীরা চরম আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তারাই এই ক্র্যাকডাউনের শিকার হন বেশি। সে সময় যৌথবাহিনীর অভিযানে অনেকে নিহত হন। গ্রেফতার করা হয় শত শত। নির্বাচনের পর বিরোধী রাজনৈতিক জোট কর্মসূচি স্থগিত করলে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা হয়ে পড়ে বেপরোয়া। তাদের সাহায্য করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের মিলিত হামলায় বিরোধী অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মী বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যান। একের পর এক মামলা দেয়া হয় তাদের বিরুদ্ধে। হরতালে নাশকতা ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের অভিযোগে এসব মামলা করা হয়। মাঝে কিছু দিন পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও সম্প্রতি আবার শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মামলা আর রাজনৈতিক পরিচয়ে গ্রেফতার। বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই বিরোধী রাজনৈতিক জোটের পক্ষ থেকে; কিন্তু তারপরও বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন মামলা। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা অনেককে করা হচ্ছে আসামি। এর সুযোগ নিচ্ছে সরকারি বাহিনী। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। তাদের কেউ জামিন পাচ্ছেন আবার কেউ পাচ্ছেন না। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও প্রায় সাত হাজার নেতাকর্মী গ্রেফতার আছেন বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সারা দেশে দায়ের করা হয়েছে লক্ষাধিক মামলা। এমন নেতাকর্মীও আছেন যাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে শতাধিক মামলা। তার নিজের বিরুদ্ধেও আছে ১৪টি মামলা। বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির পাঁচ-ছয়জন নেতা বর্তমানে কারাগারে আছেন। তাদের মধ্যে আবার দু’জন স্থায়ী কমিটির সদস্য। দেশব্যাপী গ্রেফতার বিষয়ে বিএনপির এই যুগ্ম মহাসচিব বলেন, একটি সরকার যখন তার স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক রূপ হারিয়ে ফেলে তখন তারা যেকোনো কিছু করতে পারে। বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয়, বিরোধী রাজনৈতিক দলকে দমন করতে পারলেই তারা খুশি। এটি একটি সরকারের ফ্যাসিবাদী চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ। মামলা থেকে বাদ নেই বিএনপি চেয়ারপারসন এবং স্থায়ী কমিটির সদস্যরাও। দলের চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে আগে থেকেই দায়ের করা আছে একাধিক মামলা। দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের হওয়া দু’টি মামলা নিয়ে সরকার লড়ে যাচ্ছে কঠিনভাবেই। আগামী ৯ জুলাই এ দু’টি মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে। এ ছাড়া দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি মামলায় কারাগারে আছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় আটক আছেন স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী। ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে দণ্ডও ঘোষণা করেছে। মামলা আছে দলের স্থায়ী কমিটির বাকি প্রায় সব সদস্যের বিরুদ্ধেই। সরকারি গ্রেফতার অভিযানের সবচেয়ে নির্মম শিকার হচ্ছেন মূলত ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো। এর মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির ও ইসলামী ছাত্রীসংস্থার নেতাকর্মীরাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান টার্গেট। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই এসব সংগঠনের যে কাউকে যেকোনো সময় গ্রেফতার করা হচ্ছে। গ্রেফতারের পর পুলিশ গতানুগতিক একটি বক্তব্য দিচ্ছে। আটককৃতরা রাষ্ট্র ও সমাজবিরোধী কাজের ষড়যন্ত্র করছিল বলে পুলিশের বক্তব্যে বলা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বরাবরই গোপন সূত্রে এমন খবর পাচ্ছেন। গত কয়েক বছর ধরে একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে পুলিশ বিভাগ। পুলিশের গ্রেফতার থেকে বাদ যাচ্ছেন না বিরোধী রাজনৈতিক দলের নারীকর্মীরাও। গত ১৮ জুন রাজধানীর দণি গোড়ানের একটি বাসা থেকে ইসলামী ছাত্রীসংস্থার ২৪ কর্মীকে আটক করে পুলিশ। খিলগাঁওয়ের দণি গোড়ান এলাকার শান্তিপুর মসজিদের পাশের একটি ভবন থেকে তাদের আটক করা হয়। ওই ভবনে তারা রমজান উপলে কুরআনের তালিম করছিলেন বলে আটকদের পরিবারের প থেকে বলা হয়। গত বৃহস্পতিবারও লক্ষ্মীপুরে জামায়াত ও শিবিরের চার নেতাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ ছাড়া আগের দিন বুধবার শহরের আদালত এলাকা থেকে শিবিরের সাবেক শহর সভাপতি আবদুল আউয়াল রাসেলকে গ্রেফতার করা হয়। লক্ষ্মীপুরের সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাসিম জানান, বিভিন্ন স্থান থেকে পৌর জামায়াতের সেক্রেটারি শামছুল ইসলাম, জামায়াত নেতা ওমর ফারুক এবং শিবির নেতা আবদুল আউয়াল রাসেল, রেজাউল করিম সুমন ও জামালকে গ্রেফতার করা হয়। গত মঙ্গলবার বিকেলে গ্রেফতার করা হয় লক্ষ্মীপুর পৌর জামায়াতের আমির ফারুক হোসাইন নুরনবীকে। লক্ষ্মীপুর সদর থানার ওসি ইকবাল হোসেন বলেন, জামায়াত নেতা ফারুক হোসাইন নুরনবীর বিরুদ্ধে হরতালে নাশকতা ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। গত ২৬ জুন থেকে দুই দিনব্যাপী অভিযান চালিয়ে রংপুর জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিএনপি, জামায়াত ও শিবিরের ১০১ কর্মী গ্রেফতার করেছে পুলিশ। জেলার আটটি উপজেলা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। রংপুর কোতোয়ালি থানার ওসি আবদুল কাদের জিলানী জানান, গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিকেলে আদালতে নেয়া হবে। এ দিকে পুলিশের গ্রেফতারবাণিজ্য আর সরকারি দলের মামলায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি গ্রাম প্রায় পুরুষশূন্য। প্রতিদিনই পুলিশ নিরীহ লোকদের বাড়িতে গিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের ভয়ে তিন গ্রামের কয়েক শ’ পুরুষ রাতে এলাকা ছেড়ে বাইরে রাত কাটাচ্ছেন। ফলে রোজা ও নামাজ পড়তে তাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সংবাদদাতা জানান, গত ২৮ জুন কাঞ্চন পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের দিন তাড়াইল এলাকায় সহিংসতার ঘটনায় দু’টি মামলা দায়ের করা হয়। একটি মামলার বাদি তাড়াইল এলাকার ইয়ানুছ মিয়ার ছেলে নজরুল ইসলাম ১৯ জনকে নামীয় ও ১০-১৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা দায়ের করেন। এ দিকে নির্বাচনের দিন দুই প্রার্থীর মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে গুলিতে নিহত পান বিক্রেতা সুকোমল দত্তের ছেলে সুমন দত্ত বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা দায়ের করেন। এ দুই মামলা দায়েরের পর থেকে পুলিশ গ্রেফতারবাণিজ্যে নেমেছে। প্রতি রাতেই পুলিশ গ্রামে গ্রামে তল্লাশি চালাচ্ছে। পুলিশের গ্রেফতার আতঙ্কে তিন গ্রামের কয়েক শত পুরুষ রাতে এলাকা ছেড়ে বাইরে রাত কাটাচ্ছেন। গত ২৬ জুন সাভার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যন ও সাভার থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, সাভার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াতের ডাকা অবরোধ ও হরতালের সময় একাধিক যানবাহন ভাঙচুর ও গাড়ি পুড়িয়ে মানুষ হত্যা মামলাসহ ছয়টি মামলা রয়েছে। সংবাদদাতা জানান, গত ২৬ জুন পুলিশ অভিযান চালিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের আট নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে। এর আগে গত ২৩ জুন দিনাজপুরে অভিযান চালিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের ১৬ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের এই অভিযান অব্যাহত আছে। বিশিষ্টজনদের অভিমত : বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেছেন, যখন কোনো সরকার বিনাপ্রতিবাদে টিকে থাকতে চায়, তখনই তারা এমন পদক্ষেপ নিতে থাকে। সে জন্যই দেখা যাচ্ছেÑ যারা কোনো কথা বলছে বা যাদেরকে সরকার হুমকি মনে করছে তাদেরই গ্রেফতার করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হচ্ছে, অপহরণ করা হচ্ছে কিংবা মেরে ফেলা হচ্ছে। তিনি বলেন, যে সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আসে তাদের একটা বৈশিষ্ট্য থাকে। জনগণের কাছে জবাবদিহিতার ব্যাপারে তাদের একটা দায়িত্ববোধ থাকে; কিন্তু এখানে (গত নির্বাচনে) কে কাকে নির্বাচিত করেছে? সেই জন্য জনগণের কাছে এ সরকারের কোনো জবাবদিহিতা নেই। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, ঈদের পরপরই সরকার পতনের আন্দোলন হবেÑ বেগম খালেদা জিয়া ঘোষণা দিয়েছেন। এ কারণে আন্দোলনে শরিক হতে পারে এমন জনশক্তিকে সরকার গ্রেফতার করছে। বর্তমান সরকার মনে করছেÑ মামলা-হামলা করে আন্দোলনকে থামিয়ে দিতে পারবে। এটা তাদের ভুল ধারণা। বিএনপি চেয়ারপারসনের এই উপদেষ্টা আরো বলেন, দেশের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে আছে। যেকোনো সময় জনবিস্ফোরণ ঘটতে পারে। আমরা আশা করছিÑ সরকার এই দমনমূলক পথ থেকে ফিরে আসবে। অন্যথায় পরিস্থিতি এমন হবে যে, সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।

No comments:

Post a Comment