Sunday, July 6, 2014

বেসিক ব্যাংক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন আইএমএফ:কালের কন্ঠ

বেসিক ব্যাংক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির বাংলাদেশ সফরকারী ডেপুটি ম্যানিজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) ইকুইয়িনি শিনোহারা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সাথে এক বৈঠকে এই উদ্বেগের কথা জানান বলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, গত সপ্তাহে ইআরডিতে অর্থমন্ত্রীর অফিস কক্ষে সাক্ষাৎ করেন আইএমএফের সফরকারী এমডি। আইএমএফের পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয়, বেসিক ব্যাংকের সর্বশেষ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে কি না। একই সাথে ব্যাংকটিতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত কি। ব্যাংকটির পরিশোধ মূলধনের ঘাটতি রয়েছে, সেটি পূরণে সরকার কোনো উদ্যোগ নেবে কি না। এ বিষয়ে সরকারপক্ষ থেকে আইএমএফ প্রতিনিধিদলকে বলা হয়, সম্প্রতি বেসিক ব্যাংকে বেশ কয়েকটি অনিয়ম ধরা পড়েছে। ইতোমধ্যে অনিয়মের কারণে ব্যাংকটির এমডিকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং অচিরেই বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হবে। আইএমএফের পক্ষ থেকে দ্রুত বেসিক ব্যাংকের অনিয়ম দূর করার জন্য বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি সুপারিশ করা হয়। শতভাগ সরকারি মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংক ২০০৯ সাল পর্যন্ত লাভজনক ছিল। কিন্তু এরপর যখন রাজনৈতিক বিবেচনায় ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে শেখ আব্দুল হাই বাচ্চুকে নিয়োগ দেয়া হয় তখন থেকেই ব্যাংকটির আর্থিক অনিয়মের সূত্রপাত ঘটে। চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের প্রত্যক্ষ মদদে বেসিক ব্যাংকে একে একে ঘটে যায় অনেকগুলো আর্থিক কেলেঙ্কারি। এই কেলেঙ্কারিতে লুট বা আত্মসাৎ করা হয় প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা, যা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে এই চিত্র ফুটে উঠেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে গত জুনে প্রকাশিত দেশের ‘ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যাবলি’ রিপোর্টে বলা হয়েছে, জুন মাসের শেষে বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ২০১১ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪৯ কোটি টাকা। গত মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ কয়েক গুণ হবে। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করে অনেক ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখায়নি। বেসিক ব্যাংকের এ ধরনের অনিয়মের কারণে গত বছর ব্যাংকটি প্রথমবারের মতো ৪৩ কোটি ২০ টাকা লোকসান দিয়েছে। গত ২৯ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সরকারকে পরামর্শ দেয়া হয় অবিলম্বে যেন বেসিক ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেয়া হয়। এর আগে গত ২৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বেসিক ব্যাংকের এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করা হয়। কিন্তু ব্যাংকের চেয়ারম্যান সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে তাকে অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। এ দিকে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে বেসিক ব্যাংকে পরিশোধিত মূলধনেও ঘাটতি পড়েছে। এটি মেটানোর জন্য মে মাসে সরকারের কাছে আবেদন করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ব্যাংকটি মূলধন ঘাটতি মোকাবেলায় সরকারের কাছে এক হাজার ৩৭২ কোটি টাকা চেয়েছে।  ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো এক পত্রে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে সমাপ্ত অর্থবছরে ব্যাংকের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীগুলোর ভিত্তিতে ব্যাংকের প্রয়োজনীয় মূলধনের পরিমাণ ছিল এক হাজার ১৭৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। কিন্তু প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) ঘাটতির ৭৮৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা সমন্বয়ের ফলে ব্যাংকের সংরক্ষিত মূলধনের পরিমাণ মাইনাস (-) ১৯৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা। ফলে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। বেসিক ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছেÑ এ কথা স্বীকার করে এমডি এর পেছনে যুক্তিও দেখিয়েছেন। তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, ‘২০১১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষে প্রয়োজনীয় মূলধনের পরিমাণ গত ২০১৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে প্রয়োজনীয় মূলধন অপেক্ষা বৃদ্ধি পেয়েছে। যার প্রধান কারণ ব্যাংকের মোট ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া। এ ছাড়াও শ্রেণীকৃত ঋণের প্রভিশন ঘাটতি বৃদ্ধির ফলে মূলধন ঘাটতি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।

No comments:

Post a Comment