Sunday, July 6, 2014

যাত্রী দুর্ভোগ চরমে : ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য এখন বৈধ!:কালের কন্ঠ

অপেক্ষা শেষ হতে চায় না। অফিসের পর পরিশ্রান্ত শরীরটা টেনে দাঁড় করানোর পর একটা গাড়ির জন্য অপেক্ষা। কখন মিলবে কারো জানা নেই। তবে মিলতে পারে, সে আশায় অনেক মানুষ জব্বার টাওয়ারের সামনে জড়ো হন। এভাবে প্রতিদিন গুলশান থেকে মতিঝিল, কাকরাইল, মগবাজার আসা যাওয়া করার জন্য কোনো গণপরিবহন নেই। ভুক্তোভোগীরা জানান, মতিঝিলের পরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় পরিণত হওয়া গুলশান যাতায়াতে মতিঝিল থেকে কাকরাইল হয়ে নাবিস্কো ঘুরে গুলশান লিঙ্ক রোডে এখন কোনো গণপরিবহন চলে না। বছরতিনেক আগে মধুমতি পরিবহন নামে একটি বাস চললেও তা উঠে যায়। বছরখানেক আগে উঠে যায় আজিমপুর থেকে পান্থপথ হয়ে গুলশান লিঙ্ক রোড ধরে শুটিং কাব হয়ে গুলশান যাওয়া বাসটিও। সরেজমিন দেখা যায় বিকেলে অফিস শেষ করে কর্মকান্ত মানুষ জব্বার টাওয়ারের পাশের বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করেন, কখন একটি মাইক্রোবাস পাওয়া যাবে। গুলশানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঠিকায় খাটা এসব মাইক্রোবাস বিকেলে অফিস ডিউটি শেষ করে মতিঝিল কিংবা মগবাজার ফেরার সময় যাত্রী নিয়ে আসে। কিন্তু এ বাহন প্রয়োজনের তুলনায় কম। যার কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয় এসব লোককে। দুর্ভোগের এ সময়ে সিএনজি পাওয়াও মুশকিল। বিশেষ করে নারী কর্মীরা বেশি সমস্যায় পড়েন বলে জানান জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, আমরা না হয় উঠে পড়লাম, কিন্তু একজন নারী সাহস করে এ কাজটি করে বিপদে পড়তে পারেন। ঘটনাস্থলে দেখা যায়, সাধারণ যাত্রী পরিহনের জন্য দাঁড়ানো মাইক্রোবাস পুলিশি হয়রানির শিকার। তাদের দাঁড়াতে দেয়া হয় না। কখনো যদি দাঁড়াতে দেয়া হয় তবে মাইক্রো প্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা দিতে হয় পুলিশকে। এ টাকা তোলে পুলিশের হয়ে আনসার সদস্যরা। কিন্তু ঘটনাস্থলে ব্যক্তিমালিকানার গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকলে পুলিশ দেখে না বলে মনে করেন চালক মাহবুব। তিন দিন ধরে অবস্থা পর্যবেক্ষণে  দেখা যায় রাস্তার উল্টো দিক থেকে নিয়মিতই ইনডিয়ান হাইকশিনার তার গাড়ির বহর নিয়ে রাস্তা পার হন। পুলিশ, সরকারের এমপি-মন্ত্রীরাও উল্টোপথে গন্তব্যে যান। মতিঝিল নিয়মিত আসেন এমন একাধিক যাত্রী জানান, এ সঙ্কট কাটানোর জন্য সরকারের পদক্ষেপ নেয়া দরকার। মানুষের ভোগান্তি লাঘবে এই সড়কে বিআরটিসি বাস চালু করা উচিত। রফিক উল ইসলাম বলেন, এভাবে একটা রুটে কোনো গণপরিবহন নেই, আর সরকার জানে না, এটা আমরা ভাবতে পারি না। জনদুর্ভোগ লাঘবের জন্য যোগাযোগ মন্ত্রণালয় যে কাজ করছে, সেটি যদি জনগণের কোনো কাজেই না আসে, তাহলে সে কাজের দাম কী এমন প্রশ্ন রাখেন রুনা। তিনি মগবাজার থেকে গুলশানে প্রতিদিন অফিস করতে যান। গুলশানের সাথে গাবতলী, শ্যামলী, মোহাম্মদপুর ও মিরপুর থেকে ভালো গণপরিবহন রয়েছে। ফার্মগেট হয়ে ৬ নম্বর বাস সেখানে গেলেও এতে শুটিং কাব, নাবিস্কো হয়ে মগবাজার, কাকরাইলের যাত্রীরা কোনো পরিবহনই পান না। লোকাল বাসের সঙ্কট অন্য রুটেও গাবতলী, মিরপুর, চিড়িয়াখানা, আবদুল্লাহপুর, মোহাম্মদপুর থেকে একাধিক লোকাল বাস চলাচল করত রাজধানীর বিভিন্ন রুটে। কিন্তু এখন এসব বাস হঠাৎ করে লোকাল সিটিংয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। এসব বাস ভেদে ভাড়া নেয়া হচ্ছে সর্বনি¤রূপাঁচ থেকে ১০ টাকা। মোহাম্মদপুর থেকে নিউমার্কেট হয়ে ধূপখোলা যাওয়া ১৩ নম্বর বাসটি ছাড়া এখন আর কোনো লোকাল বাসের দেখা মেলে না মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝল রুটে। তাতেও ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। সর্বনি¤œ ভাড়া দাবি করা হচ্ছে পাঁচ টাকা। এ নিয়ে যাত্রীদের সাথে বাসের কন্ডাক্টরের বিতণ্ডা হয় প্রতিনিয়ত। মোহাম্মদপুর থেকে ভুলতা-গাউছিয়া যাওয়া সাবেক ১২ নম্বর বাসগুলো আগে ওই এলাকার নি¤œ আয়ের মানুষের জন্য বেশ কাজে দিয়েছিল। প্রায় বছর হতে যাচ্ছে তারা সিটিং সার্ভিসে রূপান্তর হয়েছে। তবে যাত্রী চাহিদার অজুহাতে সিটিং থাকছে না। এখন গণহারে দাঁড় করিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু ভাড়া একবার বাড়ানোর পর আর কমেনি। এ বাসটিরও সর্বনি¤œ ভাড়া পাঁচ টাকা। এ বাসে প্রথম দিকে বিজ্ঞপ্তি দেয়া ছিল এতে কোনো যাত্রী দাঁড় করিয়ে নেয়া যাবে না। পরে এটি তুলে নিয়ে লাগানো হলো তিনজনের বেশি যাত্রী দাঁড় করিয়ে নেয়া যাবে না। বিজ্ঞপ্তি থাকলেও বাসটির কর্মচারীরা এটাকে লোকাল পরিবহনে রূপান্তরিত করে সিটিং সার্ভিসের ভাড়া আদায় করে যাচ্ছে। উত্তরা, গাজীপুর থেকে আসা-যাওয়া করা বেশির ভাগ বাসই লোকাল সিটিং, ৩ নম্বর বাসটির দু-একটি লোকাল হিসেবে চলে, বাকি সব লোকাল সিটিং হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে। ৩ নম্বর বাসে বড় করে লেখা সর্বনি¤œ ভাড়া পাঁচ টাকা। নির্দেশক্রমে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। কবে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে কেউ জানাতে পারেনি যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে। গাবতলী থেকে চলমান সাবেক ৮ নম্বর বাসগুলো সবই এখন সিটিং সার্ভিস। মিরপুর থেকে চলাচল করা ১, ২ ও ১৫ নম্বর বাসগুলোর সবই এখন সিটিং সার্ভিস। এসব বাস হঠাৎ করে সিটিং সার্ভিসে রূপান্তরিত কিভাবে হলো এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি মালিক বা সরকার প থেকে। পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, ‘মালিক করেছেন। তাই তারাও এটা চালু রেখেছেন।’ সাধারণ মানুষ যা বলছেন মোহাম্মদপুরের মোস্তফা বলেন, ‘মতিঝিলে আমি ফলের ব্যবসা করি। মাসখানেক আগে প্রতিদিন এখান থেকে ১২ নম্বর বাসে যেতাম সাত টাকা দিয়ে। ক’দিন পরে ১২ টাকা করা হলো। এখন যাচ্ছি ১৫ টাকা করে।’ এটা কি কোনো ইনসাফ হলো? জিজ্ঞাসা করলেন তিনি। মিরপুরের বাসিন্দা রিমা জানান, মিরপুর ১০ নম্বর থেকে প্রতিদিন ইডেন কলেজে আসতে তাকে খরচ করতে হতো ১৫ টাকা। এখন খরচ করতে হচ্ছে ২০ টাকা। এতে করে তার পরিবারের ওপর একটা বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। একই এলাকার যাত্রী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আমিনুল বলেন, আগে মতিঝিল যেতাম ১৮ টাকা দিয়ে। এখন ২৩ টাকা। কেবল কি বাসে যাতায়াতের ভাড়া? এ ভাড়া বৃদ্ধির সাথে সাথে বাজারের যে ঊর্ধ্বগতি শুরু হয়েছে তাতে অসহায় হয়ে পড়েছি। কিন্তু কিছুই বলতে পারছি না। সরকারের কোনো পদপে নেই ভাড়া নিয়ন্ত্রণে প্রথম দিকে সরকারিভাবে কিছু পদপে নেয়া হলেও তা স্থায়ী হয়নি। কিছু দিন পর এখন এ দিকে নজর নেই সরকারের। রাস্তায় আছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। তারা ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করছেন।

No comments:

Post a Comment