ান্ড অর্ডার (ডিও) লেটার পাঠাতেন। কোন প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে হবে চিঠিতে তার উল্লেখ থাকত। সে তালিকা ধরেই প্রার্থী নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছে কমিটি। এমপির সুপারিশের বাইরে একজনকেও নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না কমিটির। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা কোটার প্রার্থীকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ দেওয়ার বিনিময়ে প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে এনামুল হক চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে নিয়েছেন। সে হিসাবে অন্তত দুই কোটি টাকা নিয়েছেন তিনি। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা টাকা দেওয়ার কথা স্বীকারও করেছেন। সংশ্লিষ্ট ইউএনও ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাও কালের কণ্ঠের কাছে স্বীকার করেছেন যে কেবল এমপির মনোনীত প্রার্থীদেরই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিধি অনুযায়ী একজন এমপি কোনো পদে প্রার্থী নিয়োগ দেওয়ার জন্য কোনো দপ্তরে ডিও লেটার বা তালিকা পাঠাতে পারেন না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেই বিধি লঙ্ঘন করে নিজের মনোনীত প্রার্থীদের চাকরি দিতে কমিটিকে বাধ্য করেছেন এনামুল হক। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগের জন্য তিন সদস্যের একটি করে কমিটি গঠন করা হয়। সংশ্লিষ্ট স্কুলের পরিচালনা পরিষদের সভাপতিকে কমিটির সভাপতি, প্রধান শিক্ষককে সদস্যসচিব এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনোনীত একজন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাকে কমিটির সদস্য করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী ২০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা শেষে চতুর্থ শ্রেণির এ পদে নির্বাচিত প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য ইউএনওর কাছে সুপারিশ করবে নিয়োগ বোর্ড। ইউএনও তা অনুমোদন করবেন। কিন্তু এমপির ডিও লেটারের মাধ্যমে প্রার্থী নিয়োগ দেওয়ায় সব কটি স্কুলেই এ প্রক্রিয়া ভণ্ডুল হয়ে যায়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমপির সুপারিশ মানতে না চাওয়ায় ইউএনও, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। বাগামারার ইউএনওর দপ্তর ও প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তর সূত্রমতে, উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ২১৪টি। প্রথম পর্যায়ে ২০১৩ সালের জুলাই মাসের শুরুর দিকে ২০টি স্কুলে দপ্তরি কাম প্রহরী পদে লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর এনামুল হক পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে ১৩ জুলাই তৎকালীন ইউএনও সাদেকুল ইসলাম এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে একটি ডিও লেটার দেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আপনার শুভ দৃষ্টি আকর্ষণপূর্বক জানাচ্ছি যে, আমার নির্বাচনী এলাকা ৫৫, রাজশাহী-৪, বাগমারা উপজেলার অন্তর্গত নিম্নলিখিত ব্যক্তিবর্গকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধীনে দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগদানের জন্য সুপারিশ করা হলো। আমার বিশ্বাস, তাদের উক্ত পদে নিয়োগদান করলে সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করবে।’ ২০টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন অন্তত ৮০ জন প্রার্থী। কিন্তু নিয়োগ কমিটি এমপির মনোনীত ২০ প্রার্থীকেই নিয়োগ দেয়। সূত্রমতে, চলতি বছরের শুরুর দিকে দ্বিতীয় ধাপে ৩২টি স্কুলে একই পদে লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর গত ২২ জানুয়ারি এনামুল হক তাঁর পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে ফের ইউএনও ও প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর দুটি ডিও লেটার দেন। এমপির সুপারিশ করা ৩২ প্রার্থীর নামসংবলিত ওই ডিও লেটারের একটি কপি কালের কণ্ঠের কাছে আছে। ইউএনও বরাবর পাঠানো ওই কপিতে দেখা যায়, একটি ডিও লেটারে ১৯টি স্কুলের নাম এবং তাঁর মনোনীত ১৯ প্রার্থীর নামের তালিকা রয়েছে। আরেকটিতে ১৩ স্কুলের নাম এবং মনোনীত প্রার্থীদের নাম রয়েছে। ৩২টি স্কুলের মধ্যে ইতিমধ্যে ৩০টি স্কুলে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এবারও এমপির মনোনীতরাই চাকরি পেয়েছেন। এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল জব্বার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাঁর (এমপি) কথার বাইরে গিয়ে নিয়োগ দেওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। এটি করা হলেই তাঁর লোকজন আমাদের ধরে পেটাবে বলে হুমকি দেয়। কাজেই এমপির দেওয়া পৃথক তিনটি ডিও লেটারের তালিকা ধরেই সবগুলো স্কুলেই দপ্তরি কাম প্রহরী নিয়োগ করা হয়েছে।’ আবদুল জব্বার আরো বলেন, ‘ডিও লেটারের মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন করতে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অযোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আবার দুটি স্কুলে নিয়োগ সম্পন্ন করা যায়নি এমপির মনোনীত প্রার্থী ও সভাপতির প্রার্থীর দ্বন্দ্বের জের ধরে।’ ওই ৫০ স্কুলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রধান শিক্ষক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিটি স্কুলের ক্ষেত্রেই একাধিক প্রার্থী থাকলেও ডিও লেটার পাওয়ার পর সবাইকে বাদ দিয়ে এমপির পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’ সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকরা দাবি করেন, প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে এমপি চার-পাঁচ লাখ টাকা করে আদায় করেছেন। এমপির পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে অস্বীকার করলে স্কুলে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধসহ শিক্ষকদেরও নানাভাবে নাজেহাল করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। অনেক সময় এমপি নিজেও হুমকি দিয়েছেন। তাই বাধ্য হয়েই নিয়োগ কমিটি এমপির পছন্দের প্রার্থীদেরই নিয়োগ দিতে ইউএনওর কাছে সুপারিশ করে। দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগ পাওয়া অনেকে কালের কণ্ঠের কাছে এমপিকে টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেন, ‘টাকা না দিলে নিয়োগ হতো না। তাই টাকা দিতে হয়েছি।’ তবে হয়রানি ও চাকরি হারানোর ভয়ে তাঁদের কেউ নাম প্রকাশে রাজি হননি। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এমপির ডিও লেটারের কারণে যাঁদের চাকরি হয়নি, তাঁদের একজন আবদুস সালাম। তিনি রনসিবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রার্থী ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় আবেদন করেছিলেন তিনি। তাঁর জায়গায় চাকরি হয়েছে আবদুল বারিক নামের এক যুবকের। আবদুস সালাম অভিযোগ করেন, ‘এমপি ও তাঁর লোকজনকে টাকা না দেওয়ায় আমার চাকরি হয়নি। যে প্রার্থী টাকা দিয়েছে তার চাকরি হয়েছে।’ ইউএনও সাদেকুল ইসলাম গত ১৯ আগস্ট বাগমারা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলায় বদলি হয়েছেন। যোগযোগ করা হলে কালের কণ্ঠকে তিনি এমপির ডিও লেটার ধরে প্রহরী নিয়োগের কথা স্বীকার করেন। বলেন, ‘এমপির চাপের কারণেই আমরা সেটি করতে বাধ্য হয়েছি। এর ফলে নিয়োগ কমিটিও কার্যত অথর্ব হয়ে পড়ে।’ আবার এমপি এনামুল হক অভিযোগ করেছেন, ‘১২টি স্কুলে নিয়োগ দিতে তাঁর সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। ইউএনও টাকার বিনিময়ে ওই ১২ জনকে নিয়োগ দিয়ে চলে গেছেন। ফলে ইউএনওই নিয়ম লঙ্ঘন করেছেন।’ জবাবে ইউএনও সাদেকুল ইসলামের দাবি, এমপির কথামতো নিয়োগ দিতে রাজি না হওয়ায় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে এ অভিযোগ তুলেছেন। এ অভিযোগ তুলেই এমপি তাঁকে বাগমারা থেকে গোমস্তাপুরে বদলি করেছেন। বাস্তবে এমপির ডিও লেটারের বাইরে একটি নিয়োগও হয়নি। কয়েকটি নিয়োগের সময় এমপির বিরুদ্ধে কথা বলায় এখন তিনি আমার বিরুদ্ধে প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন। কিন্তু আসলে এমপিই টাকা নিয়ে ডিও লেটার দিয়েছেন বলে প্রার্থীরাই আমার কাছে অভিযোগ করেছেন।’ কালের কণ্ঠের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে এমপি এনামুল হক নিয়োগ বাণিজ্যের কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘দলীয় কিছু লোকের জন্য ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে। তবে কারো কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়নি। যাদের ডিও দেওয়া হয়েছে, তারা সবাই যোগ্য প্রার্থী।’ এমপির ডিও লেটারের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হলে সরকারি বিধি লঙ্ঘন হয় কি না- এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কাশেম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্থানীয় এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের পরামর্শক্রমে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করার কথা বিধিতে বলা হয়েছে। তবে এমপির তালিকা বা ডিও লেটারের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার কোনো নিয়মের কথা আমার জানা নেই।’ পছন্দমতো প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে ডিও লেটার দেওয়ায় এবং মনোনীত প্রার্থীদের নেওয়ার জন্য নিয়োগ কমিটিকে বাধ্য করায় সরকারি বিধি লঙ্ঘন হয়েছে- এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে এনামুল হক বলেন, ‘বিধি লঙ্ঘনের কোনো বিষয় নয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমি এটি করতেই পারি। নিয়োগ দেওয়া না-দেওয়া নিয়োগ কমিটির ব্যাপার।’ ইউএনও ও প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। প্রসঙ্গত বিতর্কিত এমপি এনামুল হকের বিরুদ্ধে বর্তমানে আয়বর্হিভূতভাবে হাজার কোটি টাকার সম্পদ গোপন করার অভিযোগের তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল মঙ্গলবার তাঁর দুদকে শুনানিতে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তবে এ ব্যাপারে ৩০ দিনের সময় চেয়ে তিনি দুদকের কাছে আবেদন করেছেন।
Headlines from most popular newspapers of Bangladesh. বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রধান প্রধান দৈনিক পত্রিকার সংবাদ শিরোনামগুলো এক নজরে দেখে নিন।
Wednesday, August 27, 2014
এমপি এনামুলের ডিওতে ৫০ দপ্তরি নিয়োগ:কালের কন্ঠ
ান্ড অর্ডার (ডিও) লেটার পাঠাতেন। কোন প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে হবে চিঠিতে তার উল্লেখ থাকত। সে তালিকা ধরেই প্রার্থী নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছে কমিটি। এমপির সুপারিশের বাইরে একজনকেও নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না কমিটির। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা কোটার প্রার্থীকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ দেওয়ার বিনিময়ে প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে এনামুল হক চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে নিয়েছেন। সে হিসাবে অন্তত দুই কোটি টাকা নিয়েছেন তিনি। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা টাকা দেওয়ার কথা স্বীকারও করেছেন। সংশ্লিষ্ট ইউএনও ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাও কালের কণ্ঠের কাছে স্বীকার করেছেন যে কেবল এমপির মনোনীত প্রার্থীদেরই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিধি অনুযায়ী একজন এমপি কোনো পদে প্রার্থী নিয়োগ দেওয়ার জন্য কোনো দপ্তরে ডিও লেটার বা তালিকা পাঠাতে পারেন না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেই বিধি লঙ্ঘন করে নিজের মনোনীত প্রার্থীদের চাকরি দিতে কমিটিকে বাধ্য করেছেন এনামুল হক। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগের জন্য তিন সদস্যের একটি করে কমিটি গঠন করা হয়। সংশ্লিষ্ট স্কুলের পরিচালনা পরিষদের সভাপতিকে কমিটির সভাপতি, প্রধান শিক্ষককে সদস্যসচিব এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনোনীত একজন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাকে কমিটির সদস্য করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী ২০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা শেষে চতুর্থ শ্রেণির এ পদে নির্বাচিত প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য ইউএনওর কাছে সুপারিশ করবে নিয়োগ বোর্ড। ইউএনও তা অনুমোদন করবেন। কিন্তু এমপির ডিও লেটারের মাধ্যমে প্রার্থী নিয়োগ দেওয়ায় সব কটি স্কুলেই এ প্রক্রিয়া ভণ্ডুল হয়ে যায়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমপির সুপারিশ মানতে না চাওয়ায় ইউএনও, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। বাগামারার ইউএনওর দপ্তর ও প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তর সূত্রমতে, উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ২১৪টি। প্রথম পর্যায়ে ২০১৩ সালের জুলাই মাসের শুরুর দিকে ২০টি স্কুলে দপ্তরি কাম প্রহরী পদে লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর এনামুল হক পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে ১৩ জুলাই তৎকালীন ইউএনও সাদেকুল ইসলাম এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে একটি ডিও লেটার দেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আপনার শুভ দৃষ্টি আকর্ষণপূর্বক জানাচ্ছি যে, আমার নির্বাচনী এলাকা ৫৫, রাজশাহী-৪, বাগমারা উপজেলার অন্তর্গত নিম্নলিখিত ব্যক্তিবর্গকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধীনে দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগদানের জন্য সুপারিশ করা হলো। আমার বিশ্বাস, তাদের উক্ত পদে নিয়োগদান করলে সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করবে।’ ২০টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন অন্তত ৮০ জন প্রার্থী। কিন্তু নিয়োগ কমিটি এমপির মনোনীত ২০ প্রার্থীকেই নিয়োগ দেয়। সূত্রমতে, চলতি বছরের শুরুর দিকে দ্বিতীয় ধাপে ৩২টি স্কুলে একই পদে লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর গত ২২ জানুয়ারি এনামুল হক তাঁর পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে ফের ইউএনও ও প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর দুটি ডিও লেটার দেন। এমপির সুপারিশ করা ৩২ প্রার্থীর নামসংবলিত ওই ডিও লেটারের একটি কপি কালের কণ্ঠের কাছে আছে। ইউএনও বরাবর পাঠানো ওই কপিতে দেখা যায়, একটি ডিও লেটারে ১৯টি স্কুলের নাম এবং তাঁর মনোনীত ১৯ প্রার্থীর নামের তালিকা রয়েছে। আরেকটিতে ১৩ স্কুলের নাম এবং মনোনীত প্রার্থীদের নাম রয়েছে। ৩২টি স্কুলের মধ্যে ইতিমধ্যে ৩০টি স্কুলে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এবারও এমপির মনোনীতরাই চাকরি পেয়েছেন। এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল জব্বার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাঁর (এমপি) কথার বাইরে গিয়ে নিয়োগ দেওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। এটি করা হলেই তাঁর লোকজন আমাদের ধরে পেটাবে বলে হুমকি দেয়। কাজেই এমপির দেওয়া পৃথক তিনটি ডিও লেটারের তালিকা ধরেই সবগুলো স্কুলেই দপ্তরি কাম প্রহরী নিয়োগ করা হয়েছে।’ আবদুল জব্বার আরো বলেন, ‘ডিও লেটারের মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন করতে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অযোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আবার দুটি স্কুলে নিয়োগ সম্পন্ন করা যায়নি এমপির মনোনীত প্রার্থী ও সভাপতির প্রার্থীর দ্বন্দ্বের জের ধরে।’ ওই ৫০ স্কুলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রধান শিক্ষক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিটি স্কুলের ক্ষেত্রেই একাধিক প্রার্থী থাকলেও ডিও লেটার পাওয়ার পর সবাইকে বাদ দিয়ে এমপির পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’ সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকরা দাবি করেন, প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে এমপি চার-পাঁচ লাখ টাকা করে আদায় করেছেন। এমপির পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে অস্বীকার করলে স্কুলে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধসহ শিক্ষকদেরও নানাভাবে নাজেহাল করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। অনেক সময় এমপি নিজেও হুমকি দিয়েছেন। তাই বাধ্য হয়েই নিয়োগ কমিটি এমপির পছন্দের প্রার্থীদেরই নিয়োগ দিতে ইউএনওর কাছে সুপারিশ করে। দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগ পাওয়া অনেকে কালের কণ্ঠের কাছে এমপিকে টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেন, ‘টাকা না দিলে নিয়োগ হতো না। তাই টাকা দিতে হয়েছি।’ তবে হয়রানি ও চাকরি হারানোর ভয়ে তাঁদের কেউ নাম প্রকাশে রাজি হননি। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এমপির ডিও লেটারের কারণে যাঁদের চাকরি হয়নি, তাঁদের একজন আবদুস সালাম। তিনি রনসিবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রার্থী ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় আবেদন করেছিলেন তিনি। তাঁর জায়গায় চাকরি হয়েছে আবদুল বারিক নামের এক যুবকের। আবদুস সালাম অভিযোগ করেন, ‘এমপি ও তাঁর লোকজনকে টাকা না দেওয়ায় আমার চাকরি হয়নি। যে প্রার্থী টাকা দিয়েছে তার চাকরি হয়েছে।’ ইউএনও সাদেকুল ইসলাম গত ১৯ আগস্ট বাগমারা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলায় বদলি হয়েছেন। যোগযোগ করা হলে কালের কণ্ঠকে তিনি এমপির ডিও লেটার ধরে প্রহরী নিয়োগের কথা স্বীকার করেন। বলেন, ‘এমপির চাপের কারণেই আমরা সেটি করতে বাধ্য হয়েছি। এর ফলে নিয়োগ কমিটিও কার্যত অথর্ব হয়ে পড়ে।’ আবার এমপি এনামুল হক অভিযোগ করেছেন, ‘১২টি স্কুলে নিয়োগ দিতে তাঁর সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। ইউএনও টাকার বিনিময়ে ওই ১২ জনকে নিয়োগ দিয়ে চলে গেছেন। ফলে ইউএনওই নিয়ম লঙ্ঘন করেছেন।’ জবাবে ইউএনও সাদেকুল ইসলামের দাবি, এমপির কথামতো নিয়োগ দিতে রাজি না হওয়ায় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে এ অভিযোগ তুলেছেন। এ অভিযোগ তুলেই এমপি তাঁকে বাগমারা থেকে গোমস্তাপুরে বদলি করেছেন। বাস্তবে এমপির ডিও লেটারের বাইরে একটি নিয়োগও হয়নি। কয়েকটি নিয়োগের সময় এমপির বিরুদ্ধে কথা বলায় এখন তিনি আমার বিরুদ্ধে প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন। কিন্তু আসলে এমপিই টাকা নিয়ে ডিও লেটার দিয়েছেন বলে প্রার্থীরাই আমার কাছে অভিযোগ করেছেন।’ কালের কণ্ঠের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে এমপি এনামুল হক নিয়োগ বাণিজ্যের কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘দলীয় কিছু লোকের জন্য ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে। তবে কারো কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়নি। যাদের ডিও দেওয়া হয়েছে, তারা সবাই যোগ্য প্রার্থী।’ এমপির ডিও লেটারের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হলে সরকারি বিধি লঙ্ঘন হয় কি না- এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কাশেম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্থানীয় এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের পরামর্শক্রমে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করার কথা বিধিতে বলা হয়েছে। তবে এমপির তালিকা বা ডিও লেটারের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার কোনো নিয়মের কথা আমার জানা নেই।’ পছন্দমতো প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে ডিও লেটার দেওয়ায় এবং মনোনীত প্রার্থীদের নেওয়ার জন্য নিয়োগ কমিটিকে বাধ্য করায় সরকারি বিধি লঙ্ঘন হয়েছে- এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে এনামুল হক বলেন, ‘বিধি লঙ্ঘনের কোনো বিষয় নয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমি এটি করতেই পারি। নিয়োগ দেওয়া না-দেওয়া নিয়োগ কমিটির ব্যাপার।’ ইউএনও ও প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। প্রসঙ্গত বিতর্কিত এমপি এনামুল হকের বিরুদ্ধে বর্তমানে আয়বর্হিভূতভাবে হাজার কোটি টাকার সম্পদ গোপন করার অভিযোগের তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল মঙ্গলবার তাঁর দুদকে শুনানিতে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তবে এ ব্যাপারে ৩০ দিনের সময় চেয়ে তিনি দুদকের কাছে আবেদন করেছেন।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment