Tuesday, August 26, 2014

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতকারীরা মানবতাবিরোধী অপরাধে অপরাধী:নয়াদিগন্ত

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, যারা স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেন ও বক্তব্য রাখেন এবং জাতিকে বিভ্রান্ত করেন তারা মানবতার আদর্শ থেকে বিচ্যুত। সুতরাং মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করে তাদেরও বিচার করা উচিত। তারা বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক দলের সদস্য অথবা যে শ্রেণী-পেশার মানুষই হোক স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে
র ইতিহাস বিকৃতির দায়ে অভিযুক্ত করে তাদের গ্রেফতার ও বিচার করা রাষ্ট্র, সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের কর্তব্য। জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি প্রতিরোধ মঞ্চের উদ্যোগে ‘স্বাধীনতার চার দশকে আমাদের প্রত্যাশিত প্রাপ্তি ও অমার্জনীয় ব্যর্থতা, প্রেক্ষিত একটি বাড়ি একটি খামার এ দেশ তোমার আমার’ শীর্ষক এই আলোচনাসভা গত রোববার সকালে অনুষ্ঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি প্রতিরোধ মঞ্চের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ পাটোয়ারীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. গওহর রিজভী। আরো বক্তব্য রাখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আবু আহসান মো: শামসুল আরেফিন সিদ্দিক, সাবেক সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা শাহ জিকরুল আহমেদ, মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম, ড. প্রশান্ত কুমার রায়, অধ্যাপক ড. শহীদুল্লাহ আনসারী, অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম, অধ্যাপক এইচ এম সোলায়মান চৌধুরী সুজন, ব্যারিস্টার সোহরাব হোসেন খান চৌধুরী, শেখ নূর কুতুবুল আলম প্রমুখ। ড. গওহর রিজভী বলেন, বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন সেই সোনার বাংলা তাকে গড়তে দেয়া হয়নি। আমাদের দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মহলে বিভিন্ন দেশের ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাকে হত্যা করে তার স্বপ্নকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। আমরা বাঙালিরা সবাই চাইলে এখানো বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে পারি। আমাদের মধ্যে প্রতিহিংসা, হানাহানি থাকা উচিত নয়। অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক বলেন, হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত এবং বিদেশে থাকেন তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি যারা হত্যাকাণ্ডের চক্রান্তের সাথে জড়িত ছিলেন তাদেরও বিচার দাবি করেন তিনি। জিকরুল আহসান বলেন, যারা এ হত্যাকাণ্ড করেছে তারা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক তাদের বিচার করা হোক। ড. সিরাজুল ইসলাম বলেন, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সব ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠীর সহ-অবস্থানের জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। কাউকে হেয় ও অসম্মান করার জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করিনি। সভাপতির বক্তব্যে ৬০-এর দশকের কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ পাটোয়ারী বলেন, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। তাদের সহযোগী হিসেবে কাউন্সিল মুসলিম লীগ, কনভেনশন মুসলিম লীগ, সিডিপি, জামায়াতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম, ওলামায়ে ইসলাম, কৃষক-শ্রমিক-জনতা পার্টি এবং ভাসানী ন্যাপের একাংশ মশিউর রহমান জাদু মিয়ার নেতৃত্বে পাকিস্তানিদের সহযোগিতা করেছিল। ৯ মাস ১১ দিনের মুক্তিযুদ্ধে আমরা আমাদের বিজয় অর্জন করেছি। তিনি আরো বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় বিভিন্ন সমাজতন্ত্রীপন্থী দল সমাজতন্ত্রের ধোঁয়া তুলে ব্যাংক, ট্রেন, লঞ্চ, হাটবাজার, বাড়িঘর ডাকাতি করে যাওয়ার সময় জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে যেত। অর্থাৎ, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি জয়া বাংলা স্লোগানকে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মানুষের কাছে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য তথাকথিত সমাজতন্ত্রীরা এই অপকর্ম করেছে। তিনি আরো বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা বিভক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে ৯৮ শতাংশ রিপ্যাট্রিয়ট আর্মি এবং ৯৯ শতাংশ কলাবরেটর সিএসপিদের লোকেরা বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে অংশ নেয়। যে কারণে আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবার-পরিজনকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এবং ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে রক্ষা করতে পারিনি। বিভিন্ন সময়ে ব্যর্থ সেনা-অভ্যুত্থানের নামে মেধাবী মুক্তিযোদ্ধা ও সৈনিক অফিসার ও হাজার হাজার অফিসারকে হত্যা করা হয়েছে এটা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের এবং জাতির অমার্জনীয় ব্যর্থতা। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে কলাবরেট অ্যাক্ট আইনে ৩৬ হাজার ৭৫২ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে ২৬ হাজারকে শর্তাধীন মুক্তি দেয়া হয়। বাকি ১১ হাজার ৭৫২ জনের মধ্যে ১৯৭২-৭৫ সালে দুই শতাধিকের বিচার হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সামরিক ফরমান জারি করে এবং কলাবরেটর অ্যাক্ট বাতিল করে ক্রমান্বয়ে মুক্তি পেয়ে যান। ৫০-৬০ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচারকার্য করে কী অর্জিত হচ্ছে। প্রয়োজনে শতাধিক স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এদের মধ্যে যারা বেঁচে আছে তাদের বিচার করা হোক। নতুবা এটা অসমাপ্ত বিচারকার্য বলে মনে করি। সম্ভবত বাংলাদেশের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলে কমবেশি যুদ্ধাপরাধীদের দালাল রয়েছে। এদের চিহ্নিত করে বহিষ্কার করার আহ্বান জানান তিনি।

No comments:

Post a Comment