Monday, June 22, 2015

বাংলাওয়াশের হাতছানি:প্রথম অালো

শেষ পর্যন্ত কোন ছবিটা মনে আছে আপনার? এই ম্যাচ তো টুকরো টুকরো অনেক হিরণ্ময় ছবির কোলাজ—ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই কাচের আড়ালে মাশরাফি বিন মুর্তজার মুষ্টিবদ্ধ উল্লাস। ম্যাচ শেষে ধীর পায়ে মাঠে ঢুকে মুস্তাফিজুরের একটা স্টাম্প তুলে নেওয়া। ধোনিদের সঙ্গে হাত মেলানোর পর মাঠে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের কাঁধে কাঁধ রেখে রচিত ওই বিজয়ী মানববৃত্ত। শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে প্রতীকী বোধ হয় ওই দৃশ্যটাই—তাসকিন ও লিটনের কাঁ
ধে মুস্তাফিজুর রহমান। এ এক অবাক ক্রিকেট ম্যাচ, যেখানে স্কোরকার্ড বলছে দুই দলেরই রান সমান। অথচ এক দল ৬ উইকেটে জয়ী! এ এক অবাক ক্রিকেট ম্যাচ, যেটিতে ‘বাচ্চা’ বাংলাদেশ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয় ‘বড়’ ভারতকে! এ এক অবাক ক্রিকেট ম্যাচ, যেটি সোচ্চারে ক্রিকেট বিশ্বকে জানিয়ে দেয়, বাংলাদেশের জয় এখন আর বিস্ময়ে আচ্ছন্ন হওয়ার মতো কিছু নয়। এ এক অবাক ক্রিকেট ম্যাচ, যেটির মাহাত্ম্য শুধুই একটি জয়ের সীমানা ছাড়িয়ে আরও অনেক দূর পরিব্যাপ্ত। ভারতের বিপক্ষে প্রথম সিরিজ জয়। সেটিও এক ম্যাচ বাকি থাকতেই। খেলা শেষ হতেই তাই আকাশে-বাতাসে উড়ে বেড়াতে শুরু করল শব্দটা। ক্রিকেট অভিধানে বাংলাদেশের কল্যাণেই যেটির অন্তর্ভুক্তি—‘বাংলাওয়াশ’! আবারও সেটি হবে কি হবে না, এই প্রশ্নের উত্তর পেতে মাত্র দুই দিনেরই অপেক্ষা। তবে একটা অপেক্ষার অবসান হয়ে গেল কালই। এ জয়েই নিশ্চিত হয়ে গেল, ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশ থাকছে। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিকে শীর্ষ আট দলের টুর্নামেন্ট বানিয়ে ফেলার পেছনে আসল উদ্দেশ্য যেটিই থাকুক, এ দেশের মানুষের কাছে এর অর্থ ছিল একটা—ক্রিকেটের ‘অভিজাত’ দলগুলোর উৎসবে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে যেন অকারণ ‘ঝামেলা’ হয়ে না থাকে! মাঝখানে বিশ্বকাপ আর এর আগে-পরে জিম্বাবুয়ে আর পাকিস্তান ও ভারতের বিপক্ষে সিরিজ ক্রিকেট বিশ্বকে জানিয়ে দিল, চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলাটা বাংলাদেশের অধিকার এবং সেখানে শুধুই সংখ্যা পূরণ করতে যাওয়া নয়! ভারতের বিপক্ষে এর আগেও তিনটি জয় ছিল। তবে দুই জয়ে সবচেয়ে কম ব্যবধান ছিল প্রায় আড়াই বছরের। এই প্রথম ভারতের বিপক্ষে পরপর দুই ম্যাচে জয় এবং সেই দুই জয়েই সবচেয়ে জ্বলজ্বলে একটা নাম। মুস্তাফিজুর রহমান! প্রথম ম্যাচের মুস্তাফিজুর সব অর্থেই ছিলেন বিস্ময়। অমন হইহই রইরই অভিষেকের কারণে তো বটেই, অজানা-অচেনা এই তরুণ বিস্ময় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের জন্যও। তা প্রথম ম্যাচের মুস্তাফিজুরকে যদি বিস্ময় বলা হয়, দ্বিতীয় ম্যাচের মুস্তাফিজুরকে তাহলে কী বলা হবে! মাঝের দুই দিন ভারতীয় দলের হোমওয়ার্ক তো মুস্তাফিজুরকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। তারপরও ভারতের নামীদামি ব্যাটসম্যানদের কাছে মুস্তাফিজুর সেই একই রকম দুর্বোধ্য এক ধাঁধাই হয়ে রইলেন। আগের দিন রোহিত শর্মার আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলার ঘোষণায় লুকিয়ে ছিল হুমকি। দ্বিতীয় বলেই সেটিকে বাগাড়ম্বরে পরিণত করার কাজটাও করলেন মুস্তাফিজুরই। ওয়ানডে ক্রিকেটে তাঁর স্বপ্নযাত্রা শুরু হয়েছিল রোহিত শর্মাকে আউট করে। আরেকটি মুস্তাফিজুর-কাব্যের প্রথম স্তবকটিতেও সেই রোহিতই। চাপে জর্জর ভারতকে আরও কম্পমান করে তুলতে শুরুর ওই ধাক্কাটির অসীম ভূমিকা। ৫ ওভারের প্রথম স্পেলে উইকেট ওই একটিই। ম্যাচের ভাগ্য লিখে দিলেন দ্বিতীয় স্পেলে। মাশরাফি আবার যখন ফেরালেন তাঁকে, ম্যাচ দাঁড়িয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে। ব্যাটিং পাওয়ার প্লে শুরু হচ্ছে, স্কোর ৪ উইকেটে ১৬২ এবং উইকেটে ধোনি ও রায়না। এর কিছুক্ষণ আগেই প্রেসবক্সে ছড়িয়ে পড়েছে, কলকাতা থেকে সৌরভ গাঙ্গুলী ফোনে ভারতীয় সাংবাদিককে বলেছেন, তাঁর কাছে উইকেট বেশি সুবিধার ঠেকছে না। বাংলাদেশ খুব ভালো ব্যাটিং করলে ভিন্ন কথা, নইলে ২২০-ই এখানে জেতার মতো স্কোর। পাওয়ার প্লেটা কাজে লাগাতে পারলে ভারতের স্কোর এর চেয়ে বেশিও হতে পারত। মুস্তাফিজ-জাদুতে ওই পাওয়ার প্লে-ই ভারতের দুঃস্বপ্নে পরিণত। ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা অবশ্য এখন দুঃস্বপ্ন বলতে মুস্তাফিজের অফ কাটারকেই বোঝেন। দ্বিতীয় স্পেলের তৃতীয় বলে আততায়ী সেই কাটারেই সুরেশ রায়নাকে তুলে নিলেন। মাঝখানে এক ওভার। তৃতীয় ওভারে পরপর দুই বলে দুই উইকেট। এর মধ্যে প্রথমটিই সম্ভবত মুস্তাফিজুরের সবচেয়ে সুখের স্মৃতি হয়ে থাকবে। প্রথম ম্যাচে ধোনির ধাক্কা খাওয়ার সঙ্গে ম্যাচ ফির ৫০ শতাংশ জরিমানাও গুনতে হয়েছে। সেই ধোনি ২৬৪ ম্যাচের অভিজ্ঞতা দিয়েও মুস্তাফিজুরের কাটার বুঝতে ব্যর্থ! পাওয়ার প্লের পাঁচ ওভারে তিন উইকেট হারিয়ে ভারত তাই তুলতে পারল মাত্র ১৭ রান। ম্যাচটা সেখানেই বাংলাদেশের হাতের মুঠোয় চলে এল। মুস্তাফিজুর তো অবিসংবাদিত নায়ক, তবে পার্শ্বনায়কের ভূমিকা ভুলে গেলে অন্যায় হবে। ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপের সবচেয়ে দামি উইকেট বিরাট কোহলিকে ফিরিয়েছেন, উইকেটে সেট হয়ে যাওয়া শিখর ধাওয়ানকেও। ক্যারিয়ারে মাত্র দ্বিতীয়বার পুরো ১০ ওভার বোলিং করলেন। প্রথমবার ৩৩ রান দিয়ে কোনো উইকেট পাননি। সমান রান দিয়ে কাল নাসির হোসেনের মহামূল্যবান ২ উইকেট। নায়কের গল্প এখনো শেষ হয়নি। ওয়ানডেতে প্রথম দুই ম্যাচেই ৫ উইকেট নেওয়ার ঘটনা ছিল একটিই। বাংলাদেশের তা খুব মনে আছে। ২০১১ সালে জিম্বাবুয়ের ব্রায়ান ভিটরির ওই কীর্তি বাংলাদেশের বিপক্ষেই। ঘটনাচক্রে এই ভিটরিও বাঁহাতি পেসার। বৃষ্টি যখন খেলা থামিয়ে দিল, মুস্তাফিজুরের তখনো একটি বল বাকি। আবার খেলা শুরু হওয়ার পর ওই এক বলেই ছাড়িয়ে গেলেন ভিটরিকে। পাঁচের পর ছয়—প্রথম দুই ওয়ানডেতে ১১ উইকেট নেওয়ার কীর্তি ওয়ানডে এর আগে কখনো দেখেনি। ৪৭ ওভারের ম্যাচ বানিয়ে দেওয়া বৃষ্টির কারণে ডাকওয়ার্থ-লুইসের আবির্ভাব হলো। মুস্তাফিজুরের কাটারের মতোই দুর্বোধ্য যে সমীকরণ জানাল, ভারত যত রান করেছে, তা করতে পারলেই জিতবে বাংলাদেশ! স্ট্রোকের গরিমায় ‘গরিবের হেইডেন-গিলক্রিস্ট’ হয়ে ওঠা তামিম ও সৌম্যর ঝোড়ো সূচনায় সেটিকে কোনো রানই মনে হচ্ছিল না। কিন্তু ক্রিকেট ম্যাচ তো আর সরলরেখায় চলে না। ৯৮ রানে ৩ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর একটু হলেও সংশয় তাই উড়ে বেড়াচ্ছিল বৃষ্টিভেজা বাতাসে। স্লিপে রায়না মুশফিকের ক্যাচটি নিতে পারলে সেটি আরও জোরালো হতো। রানআউটের খাঁড়ায় মুশফিক যখন কাটা পড়লেন, তখন আর সেটি কপালে ভাঁজ ফেলার মতো কিছু নয়। নৈরাশ্যবাদী কারও মনে তারপরও যদি কোনো সংশয় থেকে থাকে, সেটিকে ঝেঁটিয়ে দূর করলেন সাকিব আল হাসান ও সাব্বির রহমান। দুর্দান্ত এক জুটিতে নয় ওভার আগেই খেলা শেষ! ‘কোন ছবিটা মনে রাখবেন’ দিয়ে শুরু হয়েছিল লেখাটা। আরেকটা ফ্রেমও বোধ হয় তাতে থাকা উচিত। ধবল কুলকার্নির বলে টালমাটাল সাব্বির উইকেটের ওপর পড়ে যেতে যেতে কোনোমতে হিট উইকেট হওয়া থেকে বাঁচলেন। পরের বলটা শর্ট আসবে অনুমান করে অদ্ভুত এক স্টান্সে দাঁড়িয়ে পুল করার ঘোষণাটা যেন জানিয়েই দিলেন বোলারকে। শর্ট বলই হলো, পুলও। বল পত্রপাঠ সীমানার বাইরে। ম্যাচের প্রতীকী ছবি হিসেবে এটাকেও রাখতে পারেন। আগেই ঘোষণা দিয়ে সাব্বিরের ওই পুলটিতেই যে বিশ্বকে জানিয়ে দেওয়া—এ এক নতুন বাংলাদেশ! দ্বিতীয় ম্যাচে ৬ উইকেটে জয় ভারত ২০০/১০ ওভার ৪৫ বাংলাদেশ ২০০/৪ ওভার ৩৮