Saturday, January 24, 2015

নাশকতার আগুনে পুড়ছে শিশুপ্রাণ:কালের কন্ঠ

খেলাধুলা করে যখন বাড়ি মাতিয়ে তোলার কথা ছিল সাফিরের, তখন সে হাসপাতালের বিছানায়। কখনো যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, কখনো ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছে। মা-বাবার কোলে নিরাপদেই ছিল আড়াই বছরের এই শিশু। তাকে নিয়ে বাবা ডা. সাইফুল ইসলাম ও মা ডা. শারমিন আহমেদ নারায়ণগঞ্জে যাচ্ছিলেন বাসে করে। চাষাঢ়ায় সমবায় মার্কেটের সামনে দুর্বৃত্তরা বাসটিতে পেট্রলবোমা ছুড়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিএনপি জোটের ডাকা অবরোধের মধ্যে গত রবিবার রাত ৯টার দি
কে ঘটে ঘটনাটি। এরপর ফুটফুটে এই শিশুর ঠিকানা হয়েছে রাজধানীর লালমাটিয়ার সিটি হাসপাতাল। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সাফিরের শরীরের ১৭ শতাংশ পুড়ে গেছে। সে আশঙ্কামুক্ত নয়। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে যন্ত্রণায় ছটফট করছে দুই বোন নূসরাত জাহান (১৩) ও ইসরাত জাহান নাদিয়া (১০)। তাদের মা মনোয়ারা বেগম গত মঙ্গলবার সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এর দুই দিন আগে মৃত্যু হয়েছে মনোয়ারার গর্ভের সাত মাসের সন্তানের। গত ১৩ জানুয়ারি রংপুরের মিঠাপুকুরে অবরোধকারী জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারদের ছোড়া পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয় এ পরিবারটি। মনোয়ারার অনাগত সন্তানসহ মাত্র ১৮ দিনের অবরোধ-সহিংসতা-নাশকতার আগুনে পুড়েছে সাতটি শিশুপ্রাণ। সেই সঙ্গে দগ্ধ বা আহত হয়ে কাতরাচ্ছে আরো প্রায় অর্ধশত শিশু। ফুলে আগুন দেওয়ার মতো করেই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা অবলীলায় বোমার আগুনে প্রায় প্রতিদিনই ঝলসে দিচ্ছে শিশুদের প্রাণ-মন-দেহ। গত ৫ জানুয়ারি ফেনীতে বোমায় আক্রান্ত হয় এসএসসি পরীক্ষার্থী মিনহাজুল ইসলাম অনিক (১৫) ও শাহরিয়ার হৃদয় (১৫)। অনিক ডান চোখে দেখতে পাচ্ছে না। চট্টগ্রামে চিকিৎসাধীন হৃদয়ও ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অনিশ্চিত এ দুই ছাত্রের। অনিকের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। গত বৃহস্পতিবার তাকে চিকিৎসার জন্য ভারতে পাঠানো হয়েছে। সাফির, নূসরাত, নাদিয়া, অনিক, হৃদয়ের মতো অনেক শিশুর জীবনই বিপন্ন করে তুলেছে অবরোধের নাশকতা। কেউ দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে, কেউ হারাচ্ছে প্রাণ। কারো দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে, কেউ হারিয়েছে নিরাপদ আশ্রয়। মাতৃগর্ভ থেকে স্কুলের পথ- অপরাজনীতির ছোবল থেকে কোথাও নিরাপদ নয় শিশুরাও। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায়ও রাজশাহীর তানোর ও পবায় অবরোধকারী শিবির ক্যাডাররা দুটি বাসে পেট্রলবোমা ছুড়লে যে ১০ জন দগ্ধ হয়, তাদের মধ্যেও দুটি শিশু রয়েছে। তাদের নাম আছিয়া ও ফারজানা। দুজনেরই বয়স পাঁচ বছর। শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনগুলোর হিসাব মতে, গত ১৮ দিনের অবরোধে সাত শিশু প্রাণ হারিয়েছে; যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। আহত হয়েছে প্রায় অর্ধশত। নাশকতার মুখে পড়ে বা স্বজনদের দুর্ভোগে চরম মানসিক বিপর্যয়েও পড়ছে শিশুরা। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এ ধরনের অবস্থা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অবোধ শিশুদের এসব নাশকতা থেকে রক্ষার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'যারা অবরোধ ডেকে নাশকতা চালাচ্ছে তারা শিশু শিক্ষার্থীদের ওপরও আক্রমণ করছে। ছাত্রছাত্রীরা, বাচ্চারা এখন হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। এটা কোনোভাবেই সহ্য করা যায় না। তাই তাদের কাছে মিনতি করছি, আমাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করবেন না।' বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের সভাপতি এমরানুল হক চৌধুরী বলেন, '২০১৩ সালেও নাশকতার শিকার হয়েছে অনেক শিশু। একই চিত্র আবার দেখতে পাচ্ছি। কোনো সভ্য দেশে শিশুদের ওপর এভাবে হামলা হতে পারে না। আর যে শিশু আহত হচ্ছে বা ঘটনা দেখছে, সে মানসিকভাবেও আঘাত পাচ্ছে। রাজনৈতিক বা আন্দোলন কর্মসূচির নামে শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা দেওয়ার অধিকার কারো নেই।' মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ডা. গোলাম রব্বানী কালের কণ্ঠকে বলেন, 'যেকোনো নাশকতার ঘটনা শিশুদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলে। আক্রান্ত হলে সে মানসিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরিবারে বা চারপাশের অরাজকতাও শিশুর মানসিক বিকাশের অন্তরায়।' বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজিএফ) কর্মসূচি সমন্বয়ক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, ২০১৩ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় আক্রান্ত হয় ১৫৬ শিশু। এর মধ্যে ৪১টি শিশু নিহত এবং ১১৫টি শিশু গুরুতর আহত হয়। এবারও শিকার হচ্ছে শিশুরা। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, গত ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ছয়টি শিশু অবরোধ-নাশকতায় প্রাণ হারিয়েছে। আর বৃহস্পতিবার মাঝরাতে মারা গেছে পরিচয় শনাক্ত না হওয়া শিশু জাকির। পুড়ে 'শেষ' পরিচয়হীন জাকির : বয়স আনুমানিক ১২ বছর। ঢাকার আশুলিয়ার গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বিছানায় ৯ দিন যন্ত্রণায় কাতরানোর পর বৃহস্পতিবার রাতে পরিচয়-ঠিকানাহীন জাকির হোসেনকে ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। সেখানে ওই রাতে ১টার দিকে চিকিৎসকরা জাকিরকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ভাগ্যহত শিশুটির লাশ পড়ে আছে ঢাকা মেডিক্যালের মর্গের হিমাগারে। তার পরিচয় কেউ জানে না। নেই কোনো স্বজনের হদিস। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অবরোধের নাশকতার বলি এই ছোট্ট ছেলেটি। গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক পরমেশ্বর মাহতা কালের কণ্ঠকে জানান, গত ১৩ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে নয়ন নামের এক ব্যক্তি শিশুটিকে তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে আসেন। নয়ন তার কোনো আত্মীয় নন। কয়েক ব্যক্তি নবীনগর বাসস্ট্যান্ডে গাড়ি থেকে শিশুটিকে অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় ফেলে যাওয়ার পর তিনি তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন বলে নয়ন জানান। ওই রাতে সেখানে একটি বাসে আগুন দেয় অবরোধ সমর্থক দুর্বৃত্তরা। পরমেশ্বর মাহতা আরো বলেন, 'ছেলেটি তার নাম জাকির- শুধু এটা বলেছে। আর কিছুই বলতে পারেনি।' ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক পার্থ শঙ্কর পাল জানান, আগুনে জাকিরের শরীরের ৭০ শতাংশই পুড়ে গিয়েছিল। মাথায় আঘাতের চিহ্নও দেখা গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিচয় শনাক্ত করার জন্য কয়েক দিন অপেক্ষা করা হবে। না পাওয়া গেলে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের জন্য জাকিরের লাশ আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হবে। মা-বাবাকে দেখা হয়নি জেসমিনের : 'মোর বেটিক (মেয়েকে) যাই মারছে, আল্লাহ যেন তাকও এই ভাবে মারে। মুই আজনীতি বোঝং না, আজনীতি করংনা, মুই বিচার চাই।' ডুকরে কেঁদে এভাবেই আহাজারি করছিলেন শিশু জেসমিনের মা শেফালী বেগম। গত ১৩ জানুয়ারি রাতে রংপুরের মিঠাপুকুরে উলিপুর থেকে ঢাকাগামী বাসে পেট্রোলবোমা হামলায় নিহতদের একজন ১৩ বছরের জেসমিন। উলিপুরের তবকপুর ২ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত সে। স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া করে বড় হবে। কিন্তু সে স্বপ্ন দুর্বৃত্তদের পেট্রলবোমার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। জেসমিনের দেহাবশেষ অঙ্গার হয়ে পড়ে থাকায় লাশ শনাক্ত করতে দেখা দেয় জটিলতা। ঘটনার পাঁচ দিন পর তার লাশ পুলিশ পাহারায় কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ধামশ্রেণী ইউপির পশ্চিম দড়িচর গ্রামে নিয়ে দাফন করা হয়। জেসমিনের বাবা রিকশাচালক আব্দুল জব্বার যেন শোকে পাথর। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, কিছুদিন আগে বসতভিটা বিক্রি করে বড় মেয়ে জবার বিয়ে দিয়ে জীবিকার তাগিদে সপরিবারে ঢাকায় যান। সেখানে তিনি রিকশা চালান। স্ত্রী শেফালী ঝিয়ের কাজ করেন। প্রায় এক বছর আগে জেসমিন মা-বাবার কাছ থেকে লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে গ্রামের বাড়িতে চাচাদের কাছে ফিরে আসে। ঘটনার দিন মা-বাবার সঙ্গে দেখা করার জন্য বিজয়রাম তবকপুর গ্রামের বাদাম বিক্রেতা রহিম বাদশা ও তাঁর মা রহিমা বেগমের সঙ্গে ঢাকায় যাচ্ছিল সে। পথে তিনজনই বোমার আগুনে পুড়ে মারা যায়। জানা গেছে, মিঠাপুকুরের নৃশংসতায় ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। ঘটনার সময় মায়ের কোলেই এক শিশু জীবন্ত দগ্ধ হয় বলে জানা যায়। পরে রহিম বাদশা ও তাঁর মা রহিমার লাশ শনাক্ত হলেও কোনো শিশুর খোঁজ পাওয়া যায়নি। মৃত শিশুর পরিচয়ও নিশ্চিত করেনি কোনো সূত্র। ধারণা করা হচ্ছে, কোলের শিশুটি পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। সোহাগের মায়ের বিরামহীন কান্না : ১৮ জানুয়ারি বরিশালের উজিরপুরে ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারায় বাসের হেলপার সোহাগ বিশ্বাস (১৬)। ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার ডাঙ্গি ইউনিয়নের শঙ্করপাশা গ্রামে সোহাগদের বাড়িতে এখনো চলছে শোকের মাতম। অকালে ছেলে হারিয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মা সেলিনা নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর দুই চোখের জল শুকিয়ে গেছে। নিহত সোহাগের মামা বাবলু মণ্ডল জানান, সোহাগকে হারিয়ে তাঁর মা সেলিনা যে মানসিক আঘাত পেয়েছেন, সেটা কাটিয়ে উঠতে পারবেন কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। কিভাবেই বা তাঁর সংসার চলবে? মামা বাবলু জানান, সোহাগের বাবার নাম মো. সাগর। সংসারের হাল ধরা হলো না তোফাজ্জলের : গত ১৩ জানুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বাসে ঘুমন্ত অবস্থায় দগ্ধ হয়ে মারা যায় বাসের হেলপার তোফাজ্জল হোসেন (১৬)। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণতলা গ্রামের ওয়াহেদ আলীর ছেলে সে। পাঁচ-ছয় বছর আগে চালক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে আসে তোফাজ্জল। তার বড় ভাই মো. হাসান মোবাইল ফোনে কালের কণ্ঠকে জানান, ছেলের শোকে মা মরিয়ম বেগম এখন পাগলপ্রায়। দিনমজুর বাবাও কাজ ফেলে ঘরে পড়ে আছেন। হাসান বলেন, 'তোফাজ্জলের স্বপ্ন ছিল ভালো চালক হবে। সংসারের অভাব দূর করবে। সংসারে অভাব দেখে সে অল্প বয়সে কাজে লেগেছিল। কিন্তু কিছুই হলো না। মাঝখান দিয়ে জানটাও গেল।' কী অপরাধ ছিল রকির? : গত ১৫ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শেখটোলায় অবরোধকারীরা উজিরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র রাজন আলী রকিকে (১৪) পিটিয়ে হত্যা করে। পরিবারের অভিযোগ, শিশুটির বাবা রুহুল আমিন শিবগঞ্জ পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। এ কারণে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা রকিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। শিবগঞ্জ উপজেলার শেখটোলা গ্রামের বাড়িতে রকির মা নাজমা বেগম এখনো বিলাপ করছেন, 'আমি ওকে একবার দেখতে চাই। আমাকে ওর কাছে নিয়ে যাও। আমাকে রেখে ছেলে আমার কই গেল?' বাবা রুহুল আমিন সন্তানের শোকে পাগলপ্রায়। কেঁদে বলেন, 'ওই পশুরা কেন আমার ছেলেকে মারল; তারা কেন আমাকে মারল না?' সাফিরের নীরব কান্না : রাজধানীর লালমাটিয়ার সিটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আড়াই বছরের সাফিরের অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক। তার পায়ে গভীর ক্ষত হয়েছে। এইচডিইউতে ভর্তি সাফিরকে অত্যন্ত সতর্কভাবে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সেখানেই চিকিৎসাধীন সাফিরের মা ডা. শারমিন ও বাবা ডা. সাইফুল বারবার ছেলের কাছে ছুটে যাচ্ছেন। যন্ত্রণায় কেঁপে কেঁপে উঠছে সাফির। মায়ের কোলে যেতে চাইছে বারবার। সাফিরের মা ডা. শারমিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, 'আমি এই জ্বালাও পোড়াও রাজনীতিকে ঘৃণা করি, যে রাজনীতি আমার নিষ্পাপ বাচ্চাকেও রেহাই দেয় না। আমার বাচ্চাটার জন্য আপনারা দোয়া করেন, ও যেন সুস্থ হয়ে ওঠে।' সাফিরের মামা মশিউর রহমান বলেন, 'বাচ্চাটা রাতে অনেক কান্নাকাটি করেছে। ও শুধু মায়ের কোলে যেতে চাইছে। পাঁচ দিন পর ওর অবস্থার ব্যাপারে জানাবে, বলেছেন ডাক্তাররা।' সিটি হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের চিফ কনসালট্যান্ট মো. শহিদুল বারী বলেন, 'সাফিরের পোড়া শরীরের জখমটি মারাত্মক। তবে কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে।' চিকিৎসকরা জানান, ছেলেটার দুই পা, মুখ, গলা, মাথাসহ শরীরের ১৭ শতাংশ পুড়ে গেছে। ছেলের শরীরের আগুন নেভাতে গিয়ে বাবা সাইফুলের হাত পুড়েছে ৫ শতাংশ; মা শারমিনের কপালে জখম হয়েছে। একটা হাতও ভেঙেছে তাঁর। সাফিরের মা ও বাবা ধানমণ্ডির আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের চিকিৎসক বলে জানা গেছে। শঙ্কায় অনিক ও হৃদয় : ফেনীতে বোমা হামলায় আহত অনিকের চোখের উন্নত চিকিৎসার জন্য বৃহস্পতিবার তাকে ভারতে নেওয়া হয়েছে। বুধবার তার বাবার হাতে পাঁচ লাখ টাকার চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনিকের বাবা মিজানুর রহমান দেশ ছাড়ার আগে কালের কণ্ঠকে জানান, চেন্নাইয়ের 'শংকর নেত্রালয়' নামের বিখ্যাত চক্ষু হাসপাতালে অনিকের চিকিৎসা হবে। এদিকে চট্টগ্রামে চিকিৎসাধীন হৃদয়ের ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। সুমনি-রিপনের কী দোষ? : ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে কাতরাচ্ছে হ্যাপি আক্তার সুমনি (১৪)। সে আজিমপুর গার্লস হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সুমনির শরীরের ১৯ শতাংশ পুড়ে গেছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। গত বুধবার লালবাগে একটি বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হয়েছে সে। একই সঙ্গে আহত হয় শাফরান আহমেদ রিপন (৬) নামে আরেক শিশু। তাকে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে চিকিৎসার পর বাসায় নেওয়া হয়েছে। ওই বিস্ফোরণের ঘটনায় নিউ মার্কেট থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বাপ্পী নিহত হন। পুলিশ জানিয়েছে, বাপ্পীই বোমা বানাতে গিয়ে অসাবধানতায় বাসার মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটায়। আর এ নাশকতার শিকার হয়েছে দুই শিশু। সুমনি বাপ্পীর বোন ঝুমুরের মেয়ে। দগ্ধ সুমনি জানায়, প্রতিবেশী রিপনকে নিয়ে সে টেলিভিশন দেখছিল। তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে। যন্ত্রণায় ছটফট করছে দুই বোন : গত ১৩ জানুয়ারি রংপুরের মিঠাপুকুরে বাসে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হয়ে এখন ঢাকা সিএমএইচে চিকিৎসাধীন নূসরাত ও নাদিয়া। গত মঙ্গলবার রাতে তাদের দগ্ধ মা মনোয়ারা বেগম মারা গেছেন। এর দুই দিন আগে মৃত সন্তান প্রসব করেন তিনি। মনোয়ারার স্বামী গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের লক্ষ্মীপুয়ারপাড়া এলাকার বাসিন্দা নূর আলম সেনাবাহিনীতে কর্মরত। তিনি মোবাইল ফোনে কেঁদে বলেন, 'বড় মেয়েটার শরীরের ২০ শতাংশ পুড়ে গেছে। ও অনেক কষ্ট পাচ্ছে। ডাক্তাররা বলছেন ধৈর্য ধরতে। আপনারা দোয়া করেন। আমার দুইটা মেয়ে ছাড়া বাঁচার আর কোনো সম্বল নাই।' একই ঘটনায় দগ্ধ হয়ে ১১ বছরের শিশু ফারজানা এখন রংপুর মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন। (প্রতিবেদনটির জন্য তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন রংপুরের নিজস্ব প্রতিবেদক স্বপন চৌধুরী ও ফরিদপুর প্রতিনিধি নির্মলেন্দু চক্রবর্তী শঙ্কর)।      

No comments:

Post a Comment