Saturday, January 24, 2015

মৃত্যুই এখন পথের সঙ্গী:যুগান্তর

টানা অবরোধে একের পর এক যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ সব ধরনের যানবাহনেই পেট্রলবোমা ও আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে চলেছে। বাড়ছে লাশের সারি। অবরোধের ১৭তম দিন মর্মান্তিক খবর ছিল অগ্নিদগ্ধ ঠিকানাহীন শিশু জাকির হোসেনের করুণ মৃত্যুর ঘটনা। দগ্ধ হওয়ার ১০ দিন পর অসহায় অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যায় জাকির। আর শুক্রবার ১৮তম দিনে মৃত্যু হয় বগুড়ায় পেট্রলবোমা
য় দগ্ধ ট্রাকচালকের সহকারী আবদুর রহিমের। একই দিনে সিলেটে প্রাণ হারান সিএনজি অটোরিকশাচালক শাহজাহান মিয়া। মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে একের পর এক তাজা প্রাণ। শুক্রবার পর্যন্ত অবরোধের ১৮ দিনে দেশব্যাপী সহিংস ঘটনায় ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ গেছে কলেজছাত্র সানজীদ হোসেন অভির। টানা অবরোধে নিহতদের মধ্যে ১৮ জন পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। এছাড়া সংঘর্ষে ১০ ও অন্যান্য ঘটনায় ৫ জনের মৃত্যু হয়। অসংখ্য মানুষ ঢাকা মেডিকেলসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। অবরোধ কর্মসূচি ঘিরে যানবাহনে পেট্রলবোমা-অগ্নিসংযোগ আর ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে ৭১০টি। কমপক্ষে ১০ বার রেলে নাশকতামূলক হামলা হয়। বিভিন্ন নাশকতার ঘটনায় এ পর্যন্ত নারী-শিশু, সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক, পুলিশ, শিক্ষার্থীসহ আহত হয়েছেন ৮ শতাধিক মানুষ। মামলা হয়েছে প্রায় ৪০০। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৩০ হাজার ব্যক্তিকে। শুক্রবার রাজশাহীতে পণ্যবাহী গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে হুকুমের আসামি করে মামলা করেছে পুলিশ। বুধবার পর্যন্ত সরকারি হিসেবে আটক দেখানো হয়েছে ৭ হাজার ১৫ জনকে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, বাস্তবে এ আটকের সংখ্যা আরও বেশি। মঙ্গলবার সকাল থেকে শুরু হওয়া যৌথ বাহিনীর অভিযানে বুধবার সকাল পর্যন্ত কেবল ২৪ ঘণ্টায় আটক হয় আড়াই হাজার ব্যক্তি। গত দুইদিনে সারা দেশ থেকে আটকের সংখ্যাও এর প্রায় কাছাকাছি। বৃহস্পতিবার অগ্নিসংযোগ করা হয় ১৬টি। ভাঙচুর করা হয় ১৩টি। আটক করা হয় ১৮৩ জনকে। আর বিভিন্ন স্থানে যৌথ বাহিনীর অভিযানে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে ৪৫৫ জনকে। শুক্রবার গ্রেফতারের সংখ্যা ৫ শতাধিক। সারা দেশের মতো রাজধানীতেও ১২ ঘণ্টায় বেশকিছু ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। ঢাকার বাইরে বৃহস্পতিবার সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কের হিলালপুর ও শ্রীরামপুর এলাকায় সকালে যাত্রীবাহী দুটি বাস থেকে যাত্রী নামিয়ে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এর মধ্যে শ্রীরামপুরে একটি বাসে যাত্রীবেশী কয়েকজন দুর্বৃত্ত চালকের মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গাড়ি থামায়। পরে যাত্রীদের নামিয়ে গানপাউডার ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ভোলাইল এলাকায় বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ সড়কে একটি মাইক্রোবাস ও একটি ট্রাক পুড়িয়ে দিয়েছে ১০-১২ জন দুর্বৃত্ত। রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষ এখনও পেট্রলবোমার আতংকে দিন কাটাচ্ছেন। রেললাইনের ফিশপ্লেট খুলে নাশকতার ভয়ে রেলের যাত্রীও কমে গেছে। নাশকতার ঘটনায় রেললাইন মেরামত করতে গিয়ে ও সতর্কতা অবলম্বন করার কারণে এখন ট্রেনের সিডিউল ভেঙে পড়েছে। সকালের ট্রেন ছাড়ছে বিকালে। বিকালের ট্রেন পরদিন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অবরোধে সহিংসতায় এ পর্যন্ত যেসব মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং যত মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন তাদের অধিকাংশই সাধারণ ও নিরীহ মানুষ। তাদের প্রায় কারোই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। ১৮ দিনের অবরোধে সারা দেশে এখন পর্যন্ত যে ৩৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, তাদের ২৮ জনই সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে রংপুরের মিঠাপুকুরে বাসে জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন নারী-শিশুসহ পাঁচজন। শনিবার রাতে বরিশালের উজিরপুরে চলন্ত ট্রাকে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রলবোমার আগুনে সোহাগ (১৮) নামে ট্রাকের এক হেলপার দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। এ ঘটনায় ট্রাকচালক রিপন দগ্ধ হয়েছেন। মৎস্য ভবনের কাছে পুলিশের বাসে নিক্ষেপ করা হয় পেট্রলবোমা। এতে দগ্ধ হয়েছেন দুই পুলিশ ও আহত হয়েছেন ১১ জন। নগরীতে পুলিশের বাসসহ কমপক্ষে ১১ গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নির্মম ঘটনা ঘটেছে ১৩ জানুয়ারি রংপুরের মিঠাপুকুরে। এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তিরা হলেন- কুড়িগ্রামের রহিমা বেগম, তার ছেলে রহিম বাদশা ও মেয়ে জেসমিন আক্তার এবং রংপুরের তছিরন বেগম ও ২ বছরের এক শিশু। ৮ জানুয়ারি ঢাকার ইস্কাটনে অবরোধকারীদের পেট্রলবোমায় দগ্ধ হন প্রাইভেটকার চালক আবুল কালাম। এদিকে নাশকতা প্রতিরোধের জন্য সরকার নানা কৌশল অবলম্বন করছে। বৃহস্পতিবার মোটরসাইকেলে একাধিক আরোহী বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সহিংসতা ঠেকাতে পুলিশ সদর দফতর থেকে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে অতিঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী সহিংসতা মোকাবেলায় গুলিও চালাতে পারবে। পাশাপাশি এসব জেলায় অভিযানের সময় থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজনের নিরিখে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিক শাস্তি প্রদান করবেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সহিংসতা রোধে আইনশৃংখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নজরদারি চালানো হচ্ছে। তারপরও সহিংসতা থামছে না। কেবলই বাড়ছে লাশের সংখ্যা।  

No comments:

Post a Comment