Monday, September 15, 2014

পাঁচ সচিবের 'মুক্তিযোদ্ধা সনদ' বাতিল:কালের কন্ঠ

ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ সংগ্রহ করে চাকরির মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর আবেদন করেছিলেন সরকারের যে পাঁচজন সচিব, তাঁদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করা হয়েছে। সেই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ‘ভারতীয় তালিকা’ ও ‘লাল মুক্তিবার্তা’য় যাঁদের নাম নেই এমন ৪৫ হাজার সাময়িক সনদ গ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধার সনদ স্থগিত করা হয়েছে। এর মধ্যে যাঁরা সরকারি অনুদান পেয়ে থাকেন তাঁদের এখন থেকে অনুদান গ্রহণকালে সেই সনদ ভুয়া প্র
মাণিত হলে টাকা ফেরত দেবেন- এমন শর্তে মুচলেকা দিতে হবে। আবার যাঁরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কিন্তু সনদ সংগ্রহ করেননি তাঁরা নতুন করে আবেদনের সুযোগ পাবেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে তার আলোকে আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে আবেদন করতে হবে। গতকাল রবিবার জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জামুকা কার্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। মুক্তিযোদ্ধার সনদ গ্রহণে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত শেষে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দেওয়া সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচ সচিবের মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও গেজেট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিল জামুকা। এই পাঁচ সচিব হলেন স্বাস্থ্যসচিব নিয়াজ উদ্দিন মিয়া, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সচিব এ কে এম আমির হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান (বর্তমানে প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় বেসরকারীকরণ কমিশনের চেয়ারম্যান), মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওএসডি হওয়া সচিব কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকী এবং একই মন্ত্রণালয়ের ওএসডি হওয়া যুগ্ম সচিব আবুল কাসেম তালুকদার। দুদকের তদন্তে তাঁদের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়ার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠে ‘আবারও যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত মুক্তিযোদ্ধা তালিকা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। গতকালের সভা শেষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সাংবাদিকদের জানান, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে মুক্তিযোদ্ধা সনদ সংগ্রহ করার কারণেই সচিবদের সনদগুলো বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিতে হলে জামুকায় আবেদন করতে হয়। তারপর পাঁচটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গেজেট করে সনদ দেওয়া হয়। কিন্তু নিয়াজ উদ্দিন মিয়া, এ কে এম আমির হোসেন ও আবুল কাসেম তালুকদার জামুকায় আবেদনই করেননি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকী জামুকায় আবেদন করলেও তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় ছিল না। তিনি একটি গ্রুপের সঙ্গে যৌথভাবে আবেদন করেছিলেন। কেবল মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান জামুকায় আবেদন করেছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই তিনি সনদ সংগ্রহ করেন বলে তাঁর সনদও বাতিল করা হয়েছে। মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার এবং অন্যরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হলে সনদের জন্য নতুন করে আবেদন করতে পারবেন বলে মন্ত্রী জানান। উল্লেখ্য, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তা হিসেবে উল্লিখিতরা চাকরিতে যোগদানের সময়ই মুক্তিযোদ্ধার সনদ দেখানোর কথা থাকলেও তাঁরা তা করেননি। মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদ সংগ্রহ করার দায়ে ওই সচিবদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না- জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী বলেন, ‘এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো এখতিয়ার আমাদের নেই। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে পারে।’ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিগত মহাজোট সরকার ক্ষমতায় বসার পর মুক্তিযোদ্ধা চাকরিজীবীদের চাকরির বয়সসীমা এক বছর বাড়ানো, চাকরি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার উত্তরাধিকারীদের কোটা নির্ধারণ করার পর মুক্তিযোদ্ধার সনদ সংগ্রহের হিড়িক পড়ে। গত পাঁচ বছরে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পেশার মোট ১১ হাজার ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েছেন বলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে জানা গেছে। চাকরিজীবীদের মুক্তিযোদ্ধার সনদ যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এলে সেগুলোও তদন্ত করে মতামত দেওয়া হয়। এ ছাড়া সনদ গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ পাওয়া গেলে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা- এনএসআইয়ের মাধ্যমে তা তদন্ত করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ প্রক্রিয়ায় মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদ গ্রহণের অভিযোগে ইতিমধ্যে ১৮২ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সনদ বাতিল করা হয়েছে। গতকালের বৈঠকে গত ১১ বছরে যেসব ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সাময়িক সনদ নিয়েছেন, তাঁদের সনদ পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামুকা। এ জন্য ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারীদের তালিকা (মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে সংরক্ষিত) ও মুক্তিবার্তার (লাল বই হিসেবে পরিচিত) তালিকার বাইরে মুক্তিযোদ্ধার যেসব সাময়িক সনদপত্র রয়েছে, সেগুলো স্থগিত করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এ রকম সনদ গ্রহণকারীদের সংখ্যা ৪৫ হাজার হবে বলে জানা গেছে। যাঁদের সনদ যাচাই-বাছাইয়ের লক্ষ্যে স্থগিত করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে যাঁরা সরকারি ভাতা পেয়ে থাকেন তাঁদের ভাতা স্থগিত হবে কি না- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাইব তাঁরা যেন ভাতা গ্রহণ না করেন। আর কেউ গ্রহণ করলে তাঁকে মুচলেকা দিতে হবে, তাঁর সনদ বাতিল হলে তিনি টাকা ফেরত দেবেন।’ মুক্তিবার্তায় তালিকাভুক্ত কারো কারো বিরুদ্ধেও ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’র অভিযোগ রয়েছে- এ প্রসঙ্গ তোলা হলে মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, এ রকম অভিযোগও খতিয়ে দেখা হবে। তিনি আরো বলেন, ‘ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারীদের যে তালিকা ভারত সরকারের কাছ থেকে পাওয়া গেছে, সেটাকে আমরা প্রকৃত তালিকা হিসেবে গণ্য করছি। তবে একাত্তরের শেষ দুই মাসে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারীদের নাম ওই তালিকায় নেই।’ স্বাধীনতার পর ভারত থেকে যে কাগজপত্র দেওয়া হয়েছে তাতে ৬৯ হাজার ৮৩৩ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার তথ্য রয়েছে বলে জানা গেছে। আর ১৯৯৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল মুক্তিযোদ্ধার যে তালিকা তৈরি করে, তাতে রয়েছে এক লাখ ৫৪ হাজার মুক্তিযোদ্ধার নাম, যার মধ্যে ভারতে তালিকাভুক্তরাও রয়েছেন। জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনলাইন ডেটাবেইসে সর্বশেষ গত ৩০ মার্চ পর্যন্ত সংযুক্ত হয়েছে দুই লাখ ৩০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার তথ্য, যদিও গত বছরের ১০ জুন জাতীয় সংসদে তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সারা দেশে দুই লাখ পাঁচ হাজার ৪৮২ জন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। যে ৪৫ হাজার জনের সনদ স্থগিত করে যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাঁরা মূলত অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ নেওয়ার কাগজপত্র জমা দিয়ে সাময়িক সনদ নিয়েছেন বলে জানা গেছে। গতকালের বৈঠকে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণের কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট উপকমিটি কাজ সম্পন্ন করতে না পারায় তা করা সম্ভব হয়নি। আগামী সভায়ই মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হবে। এরপর উপজেলা পর্যায় থেকে কমিটি গঠনের মাধ্যমে শুরু হবে স্থগিত হওয়া সাময়িক সনদ গ্রহণকারীদের এবং মুক্তিযোদ্ধার সনদের জন্য নতুন করে আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাইয়ের কাজ। মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানান, আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যেই যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হবে এবং আগামী স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চের মধ্যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে; দেওয়া হবে ৯ ধরনের নিরাপত্তা-সংবলিত ডিজিটাল সার্টিফিকেট। মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য মন্ত্রণালয়ে অনলাইনে আবেদনের সর্বশেষ সময় ছিল গত বছরের ৬ অক্টোবর। ওই সময়ের মধ্যে এক লাখ পাঁচ হাজার আবেদন জমা পড়ে বলে জানা গেছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী জানান, অনেকেই আবেদনের জন্য আবারও সময় চেয়েছেন। এ জন্য তাঁদের আরেকবার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে আবেদন করা যাবে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে, এর আলোকে নতুন আবেদন করতে হবে বলে তিনি জানান।

No comments:

Post a Comment