Sunday, June 21, 2015

প্রাথমিক সমাপনীতে পদে পদে দুর্নীতি:যুগান্তর

ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুরের ডালিয়া আদর্শ কিন্ডারগার্টেনের ছাত্রী ফারজানা আক্তার সুমী ২০১৪ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। কিন্তু সে বৃত্তি পায়নি। অথচ তারই ক্লাসে জিপিএ-৪.২০ পেয়েও বৃত্তি পেয়েছে এক শিক্ষার্থী। সুমীর অভিভাবক প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরে (ডিপিই) এ বিষয়ে অভিযোগ করেন। পটুয়াখালীর বাউফল-দাসপাড়া মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী সাবেকুন্নাহার মেভিজের অভিভাবকরাও একই অভিযোগ করেন।
মেভিজের ক্লাসের ২৩ জন বৃত্তি পেয়েছে। কিন্তু সে পায়নি। অথচ ক্লাসে তার রোল নম্বর ৯। ঢাকার মিরপুর মডেল একাডেমির প্রধান শিক্ষক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাসের অভিযোগ, তার বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী বাংলায় কম নম্বর পেয়েছে। ছাত্রীরা এত কম নম্বর পাওয়ার কথা নয়। তাদের পরিকল্পিতভাবে কম নম্বর দেয়া হয়েছে। এ বিষয়েও সংশ্লিষ্ট দফতরে অভিযোগ দেয়া হয়েছে। ডিপিইতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি না পাওয়া, বিভিন্ন বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত নম্বর না পাওয়া, উত্তরপত্রে নম্বর কম-বেশি দেয়া, নম্বর যোগ করার ক্ষেত্রে (ডাটা এন্ট্রি) দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতিসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও করেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। তাদের দাবি, অর্থের বিনিময়ে উত্তরপত্রে গোপন কোড নম্বর ফাঁস করে দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট খাতায় দেয়া হয়েছে বেশি নম্বর। কিছু ক্ষেত্রে রফা না হওয়ায় খাতায় নম্বর কমিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। চাহিদামতো খুশি না করায় শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত নম্বরের চেয়ে কম নম্বর উঠানো হয়েছে রেজাল্ট শিটে। ডিপিইসহ সারা দেশের শিক্ষা অফিসে এ ধরনের কমপক্ষে ৩৫ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে অনেক অভিযোগ প্রমাণিতও হয়েছে। নম্বর কম দেয়ার মতো ৮ হাজার ঘটনা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। ফলে তাদের খাতা মূল্যায়ন শেষে নতুনভাবে ফল ঘোষণা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত থাকায় ১৭ শিক্ষক, দুই শিক্ষা অফিসার, দুই ডাটা এন্ট্রি অপারেটর এবং এক অফিস সহকারীকে সাময়িক বরখাস্তসহ নানা ধরনের শাস্তি দেয়া হয়েছে। আরও বেশকিছু শিক্ষক ও শিক্ষা অফিসারের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। পরীক্ষায় এভাবে অনিয়ম আর দুর্নীতি প্রমাণের ঘটনায় খোদ অধিদফতরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিপিই মহাপরিচালক মো. আলমগীর বুধবার দুপুরে যুগান্তরের কাছে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ঢালাওভাবে যে রকম অভিযোগ করা হচ্ছে বাস্তবতা আসলে তা নয়। ৩০ লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছে। এর মধ্যে কিছু ভুলভ্রান্তি হতেই পারে। তবে যে বা যারা ভুল করেছে, তাদের শাস্তি দেয়া হয়েছে। কেউ সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। কারও ইনক্রিমেন্ট কাটা গেছে। আরও অনেকের বিরুদ্ধেই তদন্ত চলছে। তদন্তে প্রমাণিত হলে তাদেরও শাস্তি পেতে হবে। ডিপিই ও মাঠপর্যায়ের একাধিক শিক্ষা অফিসার বলেছেন, একশ্রেণীর শিক্ষক এবং অফিসার পরীক্ষা নিয়ে এই স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। মূলত নিজের প্রাইভেট পড়ানো ও কোচিংয়ের শিক্ষার্থী বা প্রভাবশালীদের সন্তানকে ভালো ফল করানোর মানসিকতা থেকেই এ ধরনের অনৈতিক কাজ করছেন। এদের চক্রটি পরীক্ষার হলে বলে দেয়া বা পরে উত্তরপত্রে নম্বর বাড়িয়ে দেয়া বা নম্বর যোগকালে (ডাটা এন্ট্রি) কম-বেশি করছে। এ পরীক্ষায় ভালো ফলের সঙ্গে বৃত্তি পাওয়া না পাওয়ার বিষয় জড়িত না থাকলে দুর্নীতি এভাবে ছড়াতো না বলে মনে করেন এসব অফিসার। ডিপিই এবং জেলা শিক্ষা অফিসে দায়ের হওয়া অভিযোগে দেখা গেছে, ঢাকার মিরপুর মডেল একাডেমি স্কুলের সব শিক্ষার্থী বাংলা বিষয়ে কম নম্বর পেয়েছে। এ স্কুলের প্রধান শিক্ষক সুভাশীষ কুমার বিশ্বাসের অভিযোগের ভিত্তিতে ওই খাতাগুলো তলব করে ডিপিই। পরে তা পুনরায় মূল্যায়ন করে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট পরীক্ষক শিক্ষার্থীদের ন্যায্য নম্বরের চেয়েও কম দিয়েছেন। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় খাতা মূল্যায়নকারী সায়দাবাদের করাতিটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা মোছা. সামছুন নাহারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একইভাবে ভোলার দশকান্তি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক লোকমান হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয় যে, তিনি নম্বর প্রদানে খামখেয়ালির আশ্রয় নিয়েছেন। যে শিক্ষার্থী বেশি পাওয়ার যোগ্য তাকে কম, আবার যার কম পাওয়ার কথা তাকে বেশি নম্বর দেয়া হয়েছে। এ অপরাধে ওই শিক্ষককেও বরখাস্ত করা হয়েছে। পরীক্ষা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে লালমোহনের শিক্ষা অফিসারের বিরুদ্ধে। ফলে এ অফিসারকে বরখাস্ত করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার রিয়াজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গার উপজেলা শিক্ষা অফিসের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আলী আকবর, আখাউড়ার অফিস সহকারী মাইনুল হোসেনসহ একাধিক কর্মচারীকেও বরখাস্তের পাশাপাশি বিভাগীয় মামলার মুখোমুখি করা হয়েছে। উত্তরপত্রের গোপন কোড নম্বর ফাঁস করে দেয়ার দায়ে বরগুনার ১৫ শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এভাবে কক্সবাজারের রামু উপজেলার রুখসানা, ফুলপুর ডালিয়া আর্দশ কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার সুমী, মাদারীপুর শিবচরের রহিমা আজিজ কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীর অভিভাবক দেলোয়ার হোসেনসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অভিভাবক-শিক্ষার্থী ও স্কুল শিক্ষকরা ডিপিইতে অভিযোগ করেছেন। পাবনা, বগুড়া, পটুয়াখালী, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এভাবে নানা অভিযোগ জমা পড়েছে। এ ধরনের অসংখ্য অভিযোগ নিয়ে এখনও কাজ চলছে। বেশ কয়েকজন উপজেলা শিক্ষা অফিসার এবং অফিস সহকারী ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিপিই অতিরিক্ত মহাপরিচালক ড. আবু হেনা মো. মোস্তফা কামাল মঙ্গলবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, ‘যেসব অভিযোগ পেয়েছি, সবগুলোর প্রতিই আমরা নজর দিয়েছি। ইতিমধ্যে বেশকিছু অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে। অধিকতর তদন্তের স্বার্থে আরও কিছু অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মাঠপর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। এসব তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় দুর্নীতি ভর করেছে বলে বেশকিছু দিন ধরেই অভিযোগ করছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘গণসাক্ষরতা অভিযান’র (ক্যাম্পে) নির্বাহী পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একাধিকবার বলেছেন, প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় দুর্নীতি ঢুকে গেছে। সর্বশেষ গত ৭ জুন জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয় শিক্ষক কর্মচারী ফ্রন্টের এক সভায় তিনি বলেন, সমাপনী পরীক্ষার কারণে একশ্রেণীর শিক্ষক-অভিভাবক দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। এ পরীক্ষা আর রাখা ঠিক হবে কিনা- এমন প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে চলতি মাসের গোড়ার দিকে রাজধানীর এলজিইডি ভবনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানেও তিনি প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা বাতিলের দাবি তোলেন। শনিবার বিকালে যোগাযোগ করা হলে রাশেদা কে চৌধুরী এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ আমরা পাচ্ছি। শিক্ষকরা এমন ঘটনাও বলেছেন যে, শিক্ষার্থীর অংক হয়নি। কিন্তু ফল না দেখেই নম্বর দিতে বলা হয়েছে। খাতা মূল্যায়নে বানান দেখতে নিষেধ করা হয়েছে। খাতায় উদারভাবে নম্বর দিতে বাধ্য করার মতো ঘটনাও রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই পরীক্ষায় জনভোগান্তির সবচেয়ে বড় জায়গা কোচিং। আমরা ১৪ বছরের ব্যবধানে কোচিং নিয়ে গবেষণায় দেখেছি শুধু সমাপনীর কারণে কোচিং-প্রাইভেট বেড়েছে কয়েক গুণ। এতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের নাভিশ্বাস উঠার উপক্রম হয়েছে। এভাবে এ পরীক্ষা চলতে পারে না। তিনি এ পরীক্ষা বাতিলের দাবি জানিয়ে বলেন, পৃথিবীর আর কোনো দেশে অষ্টম শ্রেণীর আগে পাবলিক পরীক্ষা নেই।’ ডিপিই ও মাঠপর্যায়ের একাধিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, একশ্রেণীর শিক্ষক এবং অফিসার পরীক্ষা নিয়ে এ স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। মূলত নিজের প্রাইভেট পড়ানো ও কোচিংয়ের শিক্ষার্থী বা প্রভাবশালীদের সন্তানকে ভালো ফল করানোর মানসিকতা থেকেই এ ধরনের অনৈতিক কাজ করছেন। এ চক্রটি পরীক্ষার হলে বলে দেয়া বা পরে উত্তরপত্রে নম্বর বাড়িয়ে দেয়া বা নম্বর যোগকালে (ডাটা এন্ট্রি) কম-বেশি করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, যে ৩৫ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে, তার মধ্যে একই ধরনের অভিযোগের সংখ্যা হচ্ছে ৩০ হাজার। প্রকাশিত ফল মনোপূত না হওয়ায় অভিভাবকরা এ অভিযোগ করেন। বাকি ৫ হাজার অভিযোগ বৃত্তির ফল প্রকাশের পর দাখিল হয়েছে। প্রথম ক্যাটাগরির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে। আর দ্বিতীয় ধরনের অভিযোগের পর কারও ফল পরিবর্তন হলেও তারা বৃত্তির জন্য বিবেচিত হবেন না বলে ডিপিইর দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। এদিকে নাম প্রকাশ না করে ডিপিইর একাধিক কর্মকর্তা জানান, ২০০৯ সালে সমাপনী পরীক্ষা শুরু হয়। এরপর থেকেই একশ্রেণীর শিক্ষক-অভিভাবক এমনকি শিক্ষা বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ২০০৯ ও ২০১০ সালের পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, অধিকাংশ উপজেলায় প্রথম-দ্বিতীয় হয়েছে শিক্ষা অফিসার বা অফিসের অফিসারের মেয়ে বা ছেলে। বিষয়টি ডিপিইর নজরে গেলে পরে এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করলে এ দুর্নীতি বন্ধ হয়। ওই অফিসাররা জানান, মূলত উপজেলাভিত্তিক খাতা মূল্যায়ন হওয়ায় অসাধু ব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি করার সুযোগ পাচ্ছেন। এদিকে বৃত্তির বিষয়ে বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে ডিপিইর সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট অনুজ কুমার রায় বলেন, মেধাবৃত্তি উপজেলায় সেরা মেধাবী আর সাধারণ বৃত্তি ইউনিয়নে দু’জন করে ছেলে ও মেয়ের মধ্যে বণ্টন হয়ে থাকে। পরীক্ষার ফল জিপিএ’র ভিত্তিতে হলেও বৃত্তি দেয়া হয় নম্বরের ভিত্তিতে। এতে কোনো শিক্ষার্থী সব বিষয়ে গড়ে ৮০ নম্বর না পেলে জিপিএ-৫ পায় না। কিন্তু অপর শিক্ষার্থী এক বিষয়ে ৮০’র নিচে পাওয়ায় জিপিএ-৫ পায়নি। কিন্তু ৬ বিষয়ে যদি মোট নম্বর জিপিএ-৫-প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর চেয়ে বেশি (নম্বর) পায় তবে সেই শিক্ষার্থীই বৃত্তি পাবে। এখানে দুর্নীতির অভিযোগ সঠিক হবে না। ২০১৪ সালে ২৭ লাখ ৮৯ হাজার ২৬৩ শিক্ষার্থী পিইসিতে অংশগ্রহণ করে। এদের মধ্যে ২৬ লাখ ২৮ হাজার ৮৩ জন এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। তার মধ্যে ২ লাখ ৪৪ হাজার ১১ জন জিপিএ-৫ পায়। বৃত্তি পেয়েছে ৫৪ হাজার ৫০২ জন।