Monday, June 22, 2015

ইয়াবা বাণিজ্যে পুলিশসহ ১৪ জনের সিন্ডিকেট:কালের কন্ঠ

ফেনীর লালপোল এলাকা থেকে ছয় লাখ ৮০ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া পুলিশের এএসআই মাহফুজুর রহমানের কাছ থেকে ইয়াবা বিকিকিনির হিসাবের তিনটি নোটবুক জব্দ করেছে র‌্যাব।
ওই নোটবুকে পুলিশ, আইনজীবী, মুহুরিসহ ১৪ জনের নাম আছে। এই ১৪ জনের সঙ্গে ইয়াবা বিক্রির ২৮ কোটি ৪৪ লাখ ১৩ হাজার টাকা লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে। তালিকায় থাকা ১৪ জনই ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত বলে র‌্যাবকে জানিয়েছেন এএসআই মাহফুজ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, কক্সবাজারে অতীতে কর্মরত ছিলেন এমন বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন- এমন তথ্য পাওয়া গেছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে মাহফুজুর রহমানের গতিবিধির ওপর আগে থেকেই লক্ষ রাখা হচ্ছিল। গত শনিবার রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। মাহফুজের নোটবুকে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের কিছু নাম ও টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছেন তাঁরা। উদ্ধার করা মাদক, নোটবুকসহ অন্যান্য জিনিস। ইনসেটে গ্রেপ্তার হওয়া এএসআই মাহফুজ। ছবি : কালের কণ্ঠ এ ব্যাপারে জানতে চাইলে র‌্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতা উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, মাহফুজের নোটবুকে ইয়াবা ব্যবসাসংক্রান্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। র‌্যাব-৭-এর জনসংযোগ কর্মকর্তা, সহকারী পরিচালক সোহেল মাহমুদ বলেন, '১৪ জনের নাম ও তাদের সঙ্গে টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে নামের পাশে পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা নেই। এরপর তালিকাভুক্ত ১৪ জনকেই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় আসামি করা হবে।' নোটবুকে প্রত্যেকের নামের সঙ্গে টাকার অঙ্ক লেখা আছে। সেখানে লেখা : তোফাজ্জল হোসেন- এক কোটি ৫০ লাখ ৯২ হাজার, কাশেম- ৪৩ লাখ ৪০ হাজার, আজাদ- ছয় লাখ, গিয়াস মামা- ৬৫ লাখ ৬০ হাজার, গিয়াস- এক কোটি ৮০ লাখ, গোবিন্দ দা- চার লাখ, সেলিম- ৩৮ লাখ ৩৭ হাজার, শাহিন- আট লাখ ৯০ হাজার, অ্যাডভোকেট জাকির- ৬৩ লাখ ১০ হাজার, হাইকোর্টের মুহুরি মোতালেব- ২০ কোটি, ৩৭ লাখ ৪ হাজার, এসআই আমিরের বন্ধু- চার লাখ ১০ হাজার, মামা হান্নান (কুমিল্লা)- ২১ লাখ ৭০ হাজার এবং এসআই আশিক (চট্টগ্রাম)- ৪৬ লাখ টাকা। টাকাগুলো ১৪ জনের যৌথ বিনিয়োগ নাকি ইয়াবা ব্যবসা করে তাঁদের অর্জিত মুনাফা- সে বিষয়ে র‌্যাব সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানাতে পারেনি। র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, মাহফুজুর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, ২০১১ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কক্সবাজারের টেকনাফ থানায় চাকরি করেন তিনি। ওই সময় ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে। কক্সবাজার জেলা ডিবির কর্মকর্তা সহকারী উপপরিদর্শক মো. বেলাল এবং চট্টগ্রামের কুমিরা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক মো. আশিক ইয়াবাগুলো তাঁকে ঢাকায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য বলেছিলেন। আর ঢাকা থেকে ইয়াবাগুলো বুঝে নেওয়ার কথা ছিল হাইকোর্টের মুহুরি মো. মোতালেব, অ্যাডভোকেট জাকির, বিশেষ শাখার কনস্টেবল শাহীন, কাশেম ও গিয়াসের। তবে পথিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে যান মাহফুজুর রহমান। কুমিরা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের দায়িত্বে উপপরিদর্শক মো. আশিক নামের কেউ নেই বলে জানিয়েছেন হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী পুলিশ সুপার গোলাম মোহাম্মদ। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, 'আশিক নামে এখানে কেউ নেই।' এ ব্যাপারে র‌্যাবের সহকারী পরিচালক সোহেল মাহমুদ বলেন, 'মাহফুজুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী আশিকের বর্তমান কর্মস্থল কুমিরা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি। এর আগে আশিক কক্সবাজার জেলায় কর্মরত ছিল।' 'ইয়াবা' পুলিশের দায়িত্ব ঘাটে ঘাটে : জানা গেছে, কক্সবাজার জেলায় কর্মরত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে যাঁরা ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তাঁদের নিয়ে একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ওই তালিকা ধরে কিছুদিন আগেও ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত কিছু সদস্যকে বদলি করা হয়েছে, তবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ পাওয়া গেছে, বর্তমানে 'ইয়াবা ব্যবসায়ী' পুলিশ সদস্যরা কক্সবাজারের চকরিয়া, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার বিভিন্ন থানা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, ফেনী ও কুমিল্লা জেলা হয়ে ঢাকা পৌঁছানো পর্যন্ত ঘাটে ঘাটে কর্মরত আছেন। নিয়মিত দায়িত্ব পালনের ফাঁকে ফাঁকে এসব পুলিশ সদস্য নিরাপদে ইয়াবার চালান গন্তব্যে পৌঁছে দিতে সহযোগিতা করেন। ইয়াবা পাচারের অভিযোগে ইতিপূর্বে একাধিক কনস্টেবল গ্রেপ্তার হওয়ার পরও বিষয়টি পুলিশের নজরে এসেছিল। জানা গেছে, চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি রাতে চট্টগ্রামের শাহ আমানত সেতু এলাকার দক্ষিণ প্রান্তের টোল প্লাজায় শ্যামলী পরিবহনের একটি বাস থেকে ইয়াবাসহ পুলিশ কনস্টেবল নাজমুলকে গ্রেপ্তার করেছিল ডিবি। এ ছাড়া জানুয়ারি মাসে কক্সবাজারের চকরিয়া থানার পুলিশ ৫০০ পিস ইয়াবাসহ পুলিশ কনস্টেবল রবিউলকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার হওয়া নাজমুল কক্সবাজার জেলার চকরিয়া থানার একটি ফাঁড়িতে কর্মরত কনস্টেবল বলে পরিচয় দেন। এরপর ঘটনাটি মীমাংসার জন্য নগর গোয়েন্দা পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা মো. আশিক তৎপরতা চালিয়েছিলেন। এরপর কর্ণফুলী থানায় দায়ের করা মামলায় নাজমুলের পুলিশ পরিচয়টি রাখা হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, ৪০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে ২০ হাজার পিস গায়েব করে ফেলে ডিবির দল।