Monday, June 22, 2015

এক মুস্তাফিজেই দুই ইতিহাস:কালের কন্ঠ

একটা দল সত্যিকারের বাঘের মতো শিকারের ওপর হামলে পড়েছে, আরেকটা দল আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে থরহরিকম্প। গতকালের মিরপুরে সেই বাঘের দল বাংলাদেশ আর আক্রান্ত ভারত। জা অ্যান্ড জি
ওয়ানডে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচের প্রেক্ষাপটটা এমনই। ক্ষুধার্ত বাঘের মতো প্রথম বল থেকেই থাবা উঁচিয়ে আক্রমণ করেছে বাংলাদেশ আর হিংস্র সেই থাবার নিচে দিশাহীন ভারত খুঁজেছে এক টুকরো আশ্রয়। বাঘের ডেরায় নবাগত মুস্তাফিজুর রহমান অবশ্য সামান্যতম দয়াও দেখাননি। খেলার মাঠে দয়াদাক্ষিণ্যের রীতিও নেই। প্রতিপক্ষ যত কোণঠাসা হবে, ততই ঝাঁপিয়ে পড় প্রবল পরাক্রমে- ক্রিকেটের জনপ্রিয়তম স্লোগান এটাই। তাই প্রথম ম্যাচে ৫০ রানে ৫ উইকেট নেওয়া মুস্তাফিজ কাল নিয়েছেন ৬ উইকেট, মাত্র ৪৩ রানে। টানা দ্বিতীয় ম্যাচে ৫ বা তারও বেশি উইকেট নিয়ে দুর্দান্ত এক রেকর্ডের অংশীদার হয়েছেন সাতক্ষীরার বাঁহাতি এই তরুণ। আর তাতে ২০০ রানে গুটিয়ে যায় ভারত। বারকয়েক 'গিয়ার' বদলে যা ৯ ওভার বাকি থাকতেই টপকে গেছে বাংলাদেশ। ৬ উইকেটের এ জয়ের সঙ্গে রচিত হয়েছে ভারতের বিপক্ষে প্রথম সিরিজ জয়ের ইতিহাস, যা আরেকটি হোয়াইটওয়াশে পরিণত হওয়া বাকি! ২০১৫ বিশ্বকাপের সময় 'মওকা' বিজ্ঞাপন করে ব্যাপক আলোড়ন ফেলেছিল ভারতীয় একটি পণ্য। কে জানত, মাস তিনেক পর সেই 'মওকা'ই এভাবে বিঁধবে ভারতকেই! কাল ভারতের প্রতিটি উইকেট পতন আর বাংলাদেশের রানকে 'মওকা', 'মওকা' ধ্বনিতেই স্বাগত জানিয়েছে মিরপুরের উত্তাল গ্যালারি। আবার সেই উচ্ছ্বাসই নীরবতায় ঢাকা পড়েছে বাংলাদেশের একেকটি উইকেট পতনে। তবে সংখ্যায় তা অতি নগণ্য, গ্যালারির উল্লাসধ্বনির মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডে। উপমহাদেশের উইকেটে জেতার জন্য ২০০ খুব বেশি রান নয়, সে যতই বৃষ্টির কারণে বাংলাদেশের ইনিংসে ওভার সংখ্যা কমে ৪৭ হোক না কেন। দলীয় ৩৪ রানে তামিম ইকবালকে হারালেও বুকে ধুঁকপুকানি শুরু হয়নি, কারণ আরেক ওপেনার সৌম্য সরকার আর লিটন কুমার দাশের ব্যাট যে সিরিজ জয়ের পথে অনেকটা এগিয়ে নিয়ে গেছে বাংলাদেশকে। তামিম আউট হয়েছেন এ ম্যাচে সুযোগ পাওয়া ধবল কুলকার্নির স্লোয়ারে। কাভার ড্রাইভ করতে গিয়ে টাইমিংয়ের হেরফেরে স্লিপে ক্যাচ দিয়েছেন এ বাঁহাতি। তবে তাঁর আগে বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট যুদ্ধের আবহ আরেকবার ছড়িয়েছে তামিমকে ঘিরেই। ধবলের বলেই তাঁর জোরালো ড্রাইভ মিড অফে ধরে আউটের আবেদন করেন বিরাট কোহলি। কিন্তু টিভি রিপ্লেতে ক্যাচটির বৈধতা নিশ্চিত না হওয়ায় সেটি বাতিল করে দেন আম্পায়ার। এ নিয়ে কাল দ্বিতীয়বার নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেন কোহলি, তাতে আরেকবার উল্লাসে দুলিয়েছে মিরপুরের গ্যালারিকে, যা কোহলির জন্য মোটেও প্রীতিকর নয়! তো ওই ওভারেই ধবলের বল দুবার সীমানার বাইরে পাঠিয়ে আরেকটি বড় ইনিংসের মঞ্চ গড়েছিলেন তামিম, যদিও প্রত্যাশিত সাজসজ্জা আর হয়নি। তাতে কী? সৌম্যর সুরভিত ৩৪ আর লিটনের সাহসী ৩৬ রানের ইনিংসে জয়ের আরো কাছে গেছে বাংলাদেশ। অক্ষর প্যাটেলকে মিড উইকেটের ওপর দিয়ে গ্যালারিতে আছড়ে ফেলেছেন সৌম্য আর ওই ওভারেই জোড়া বাউন্ডারিতে লিটন জানিয়ে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধূমকেতুর মতো এসেই মিলিয়ে যাবেন না তিনি। যা দেখে মুহুর্মুহু উচ্ছ্বাসের বিস্ফোরণ ঘটেছে মিরপুরে। তবে আক্রমণাত্মক ক্রিকেটের এই ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডরদের ব্যাট একসময় থেমেছে ঠিকই, কিন্তু তাতেও মুছে যায়নি জয়ের আশা। চতুর্থ উইকেটে মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে ৫৪ রানের জুটির পর সাব্বির রহমানকে নিয়ে দলকে স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছে দিয়েছেন সাকিব আল হাসান। দেশের ইতিহাস গড়ার ক্ষণ আসবে দেশসেরা ক্রিকেটারের ব্যাটে- ক্রিকেট বিধাতার স্ক্রিপ্টটা তো এমনই হওয়ার কথা! দুই দলের দ্বৈরথের শেষদিকে জমাট লড়াই হয়েছে ধবল কুলকার্নি আর সাব্বির রহমানের, ব্যাট-বলের সঙ্গে কথার লড়াইও। ম্যাচ এবং সিরিজের মতো একতরফাভাবে এ লড়াইয়েও জয়ী বাংলাদেশের সাব্বির। বাংলাদেশের কাছে আগেও হেরেছে ভারত, তবে পরের ম্যাচে ঘুরেও দাঁড়িয়েছে। আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ের কথাই আগের দিন শুনিয়েছিলেন রোহিত শর্মা। কিন্তু সেই তিনিই কাল ম্যাচের দ্বিতীয় বলেই মুস্তাফিজের প্রথম শিকারে পরিণত হয়েছেন! টানা ভালো খেলার আত্মবিশ্বাসের বারুদে অগ্নিসংযোগ দরকার ছিল, রোহিত শর্মার উইকেট পতনের সঙ্গে সঙ্গে ঘরে যাওয়া বিস্ফোরণে মাত্রা সহ্য করা কঠিনই। গ্যালারির উচ্ছ্বাস আর লাল-সবুজ জার্সির দুর্দান্ত শরীরি ভাষার সামনে ভারত যেন জিম্বাবুয়ে কিংবা আরো দুর্বল কোনো ক্রিকেট খেলিয়ে দেশ। ভাবা যায়, ফ্রি হিট জেনেও রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে খেলছেন বিরাট কোহলি! ফিনিশার হিসেবে দারুণ সুনাম আছে মহেন্দ্র সিং ধোনির। তাই তাঁর ব্যাটিংয়ের অভ্যস্ত জায়গাটা ছয় নম্বরে। তবে সিরিজ খোয়ানোর আশঙ্কায় বাকিদের দিশেহারা দেখেই কি না ২০১২ সালের জুলাইয়ের পর কাল আরেকবার চার নম্বরে নেমেছেন ভারত অধিনায়ক। ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনালে যুবরাজ সিংকে বসিয়ে রেখে চার নম্বরে নেমে বাজিমাত করেছিলেন ধোনি। কিন্তু তিনি কাল খুবই সতর্ক, শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে বড় শট খেলেননি- এমন সতর্ক ধোনিকে ক্রিকেট বিশ্ব শেষ কবে দেখেছিল বলা মুশকিল। কিন্তু অতি আত্মবিশ্বাসের মতো অতি সতর্কতাও বিপদ ডেকে আনে। মুস্তাফিজের একটি স্লোয়ার ডেলিভারিকে যেমন লোপ্পা ক্যাচ দিয়ে ফিরে গেছেন ধোনি। ৭৫ বলে ৪৭ রান করে দলকে বিপদের মহাসমুদ্রে ফেলে ধোনির বিদায় আগের দিন মুস্তাফিজকে কাঁধের ধাক্কার চেয়ে কোনো অংশে কম মানহানিকর নয়! পূর্বাভাস মেনে বৃষ্টি এসেছিল দফায় দফায়। প্রথম ওয়ানডেতে বৃষ্টিই বাংলাদেশের ইনিংসকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছতে দেয়নি বলে মৃদু অনুযোগ আছে। কালও বাংলাদেশের সুসময়ে বৃষ্টি নামার সঙ্গে সঙ্গে 'মোমেন্টাম' হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা জেগেছিল। কিন্তু আকাশের টুকরো মেঘের মতো সে আশঙ্কাও ধুয়ে মুছে গেছে মুস্তাফিজ-নাসির-রুবেলদের দুর্দান্ত বোলিং আর ফিল্ডিং ক্ষিপ্রতায়। রাত ৮টা ১৮ মিনিটে ভারতের ইনিংস শেষের রেশটাও তাই অপরিবর্তিত- একটা দল এক তরফা শাসন করেছে মিরপুরকে আর সেটি অবধারিতভাবে বাংলাদেশ। আগের দিনও বিশ্বাস হচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল যতই প্রথম ম্যাচে হারুক, ঠিকই ঘুরে দাঁড়াবে ভারত। খোলনলচে পাল্টে ফেলার মতো একাদশেও তিনটি পরিবর্তন করেছেন ধোনি। প্রথম ম্যাচে বেধড়ক পিটুনি খাওয়া উমেশ যাদব আর 'আইপিএল স্টার' মোহিত শর্মা বাদ পড়ছেন, প্রত্যাশিতই ছিল। তবে ধোনি চমকে দিয়েছেন আজিঙ্কা রাহানেকে একাদশ থেকে ছেঁটে ফেলে, তাঁর পরিবর্তে কাল খেলেছেন আম্বাতি রায়ডু। অবশ্য মাত্র তিন বলেই শেষ তাঁর ইনিংস, ধোনির তাঁকে ঘিরে উচ্চাশাও। তার আগে শিখর ধাওয়ান আর বিরাট কোহলির জুটি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভারত তো আর জানত না যে বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা আরেকটি অজানা অস্ত্র ব্যবহার করবেন ভারতের শীর্ষ ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে! চার পেসার আর সাকিব আল হাসানের মতো বিশ্বমানের স্পিনার একাদশে থাকা সত্ত্বেও ব্যাটিং পাওয়ার প্লেতে নাসির হোসেনকে আক্রমণে এনেছেন মাশরাফি। বাংলাদেশের খণ্ডকালীন এ অফস্পিনারের বল টার্ন করবে ভেবে ব্যাকফুটে গিয়ে অন সাইডে খেলতে গিয়েছিলেন কোহলি। কিন্তু বল সোজা গিয়ে আঘাত হানে তাঁর প্যাডে। বিস্মিত কোহলি বেজায় ক্ষিপ্ত হন উৎসবরত বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের জটলা থেকে উড়ে আসা শব্দবাণে! অবশ্য বড় পর্দায় ক্ষোভে বিস্ফারিত কোহলির প্রতি সমবেদনা দেখানোর মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। যুদ্ধের ময়দানে বীরের পূজারি থাকে, বিজিতের আহাজারি শোনার মানুষ তাৎক্ষণিক খুঁজে পাওয়া কঠিন। মিরপুরের দর্শকরা তাই কোহলির ক্লোজআপ দেখে একটি উইকেট পতনে উল্লাসে মেতে ওঠে দ্বিতীয়বার। এ তো আর শুধু প্রতি স্পেলে এসে মুস্তাফিজের উইকেট তুলে নেওয়া কিংবা নাসিরের মতো খণ্ডকালীন স্পিনারের সাফল্যগাথা নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর চিন্তাশক্তির প্রয়োগ। ব্যাটিং পাওয়ার প্লেতে বোলিংয়ে এসে কোহলি আর ধাওয়ানকে ফিরিয়ে দিয়েছেন নাসির। নিজের দ্বিতীয় বলে উইকেট পাওয়া মুস্তাফিজ উৎসব করেছেন পরের দুই স্পেলেও। নিজে উইকেটের জন্য না গিয়ে রান আটকানোতেই মনোযোগী ছিলেন অধিনায়ক নিজে, তাতে তিনি সফলও। দুই স্পেলে বোলিং করিয়েছেন, দুবারই একটি করে উইকেট নিয়েছেন রুবেল হোসেন। সহ-খেলোয়াড়দের কাছে একজন অধিনায়কের আর কী চাওয়া থাকতে পারে, একজন মাশরাফির কাছেই বা দল আর কী চাইতে পারে! ভারতকে ২০০ রানে গুটিয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব শুধুই বোলার আর অধিনায়কের পাতে দিয়ে দিলে ফিল্ডারদের প্রতি অন্যায় হবে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেটের পরের ধাপে যাত্রার অন্যতম একটি অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে ফিল্ডিং। এত দিন ধরেই নেওয়া হতো যে ৩০ গজি বৃত্তের ভেতরে সহজ কিছু সিঙ্গেলস দিয়ে দেবে বাংলাদেশ। সেই ক্ষিপ্রতা নেই বলে ফিল্ডার দাঁড়াতেন বৃত্তের ওপর। কিন্তু এ সময়ের বাংলাদেশি ফিল্ডাররা দাঁড়াচ্ছেন বৃত্তের ভেতরে। দারুণ ক্ষিপ্রতায় আটকে দিচ্ছেন সিঙ্গেলস। এ দেশীয় ক্রিকেটের দীর্ঘদিনের অনুসারীদের জন্য যা মাশরাফিদের অদৃশ্য উপহারও। দৃশ্যমান উপহারের তো রীতিমতো ছড়াছড়ি। দূরের তারা মুস্তাফিজের যেমন অন্ধকার ফুঁড়ে আবির্ভাব, ভারতের বিপক্ষে প্রথম ৩০০, টানা দ্বিতীয় ম্যাচে ধোনিদের হাই প্রোফাইল ব্যাটিংকে অকার্যকর করা এবং এক ম্যাচ বাকি থাকতেই সিরিজ জিতে হোয়াইটওয়াশের সম্ভাবনাকে স্বপ্ন থেকে নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা- এমন আর কত্ত কী! আর সেসব পুরস্কারের আবরণটাও দারুণ ঝকমকে- ভারত কেন, বিশ্বের যেকোনো দলকেই আর অকারণ সমীহ করে না বাংলাদেশ, ঝাঁপিয়ে পড়ে সত্যিকারের বাঘের মতো থাবা উঁচিয়ে। তাই বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে পাকিস্তানের পর ভারতকেও হোয়াইটওয়াশের সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। দেশের মাটিতে টানা জয়ের 'দশে দশ' করা মাশরাফির দলকে ঘিরে আরো বড় স্বপ্ন দেখা আর মোটেও বাড়াবাড়ি নয়। ভারতের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ জয়ের সম্ভাবনা আর বড় স্বপ্নের বৃত্তবন্দি নয় মোটেও। ওটাই যেন এখন এ সিরিজের নিয়তি! স্বপ্ন কখনো কখনো অপূর্ণ থাকে, নিয়তি নয়।