রাজধানীর ভাষানটেকের বাসিন্দা নাসির হোসেন (২৫) হত্যা মামলার আসামিদের সঙ্গে সখ্যের অভিযোগে ভাষানটেক পুলিশ ফাঁড়ির ২১ সদস্যের মধ্যে ১৯ জনকেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আনিসুর রহমান, পাঁচজন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ও ১৩ জন কনস্টেবল। একই সঙ্গে ভাষানটেক থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গোলাম নবীকেও প্রত্যাহার করা হয়েছে। গতকাল সোমবার পুলিশের মিরপুর ব
িভাগের উপকমিশনার (ডিসি) নিশারুল আরিফ এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুলিশের নতুন একটি দলকে ওই ফাঁড়িতে যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। হত্যা মামলাটির নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ভাষানটেক থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই জহির রায়হান। গত শুক্রবার রাতে ভাষানটেক এলাকায় নাসিরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নাসিরের ভাই মো. মোশারফ ভাষানটেক থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, মামাতো বোন লাবণী আক্তারকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় সন্ত্রাসীরা নাসিরকে হত্যা করেছে। এতে সাতজন আসামির নাম উল্লেখ করা হয়। পরে আরও সাতজনের নাম থানায় পুলিশের কাছে জমা দেন মোশারফ। অবশ্য পুলিশ ও লাবণীর পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদে নয়, ঈদের দুই দিন আগে লাবণীর স্বামী মো. সোহাগকে কয়েকজন যুবকের মারধরের ঘটনার প্রতিবাদ করায় নাসিরকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এজাহারভুক্ত আসামিরা হলো: মামুন, বাবলু, আলম ওরফে কানা আলম, খোকন, চোক্কা, সুজন ও মো. সোহেল। পরে নাম জমা দেওয়া সাতজন হলো: ছালাম, আলতাব, টেবটেল কামাল, জান শরীফ, নবী, মালেক ও হাবীব। তারা ভাষানটেক বস্তির বাসিন্দা। নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, আসামিদের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর হামলারও অভিযোগ রয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে ভাষানটেক থানায় একটি মামলা করেছিলেন সদ্য বরখাস্ত হওয়া এসআই আনিসুর। মামলার এজাহারে দেখা যায়, বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে ওই ১৪ জনকে ধরতে পশ্চিম ভাষানটেক বস্তিতে অভিযান চালায় পুলিশের একটি দল। তখন আসামিরা পুলিশকে ঘিরে ফেলে হামলা চালায়। এতে দুজন পুলিশ আহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হলেও আসামিদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। জানতে চাইলে এসআই আনিসুর জানান, এমন কোনো অপরাধ নেই যা ওই আসামিরা এলাকায় করে না। তারা একাধিক মামলার আসামি। আসামিদের সঙ্গে সখ্যের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমিই তো তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলাম। সখ্যের প্রশ্নই আসে না।’ তবে এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, নাসিরকে মারার পর সন্ত্রাসীরা এলাকায় চিৎকার করে বলেছিল, প্রতি মাসে তারা পুলিশ ফাঁড়িতে টাকা দেয়। তাদের কেউ কিছু করতে পারবে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কানে যাওয়ার পর সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরিদর্শকের বিরুদ্ধে অভিযোগ: এদিকে আসামিদের কয়েকজনের নাম এজাহারভুক্ত না করা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগে ভাষানটেক থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গোলাম নবীর বিরুদ্ধে গত রোববার পুলিশের মিরপুর বিভাগের ডিসির কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন নাসিরের ভাই মো. মোশারফ। এতে বলা হয়, মোশারফ তাঁর ভাই হত্যায় জড়িত ১৪ জনের নাম দিলেও গোলাম নবী শুধু সাতজনের নাম এজাহারভুক্ত করেছেন। বাকিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। নামগুলো বলার পর তিনি নিজেই এজাহার লিখেছেন। কী লেখা হয়েছে, তা জানতে চাইলেও তিনি বলেননি। বরং এজাহারের কপি চাইলে গোলাম নবী তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে থানা থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে গোলাম নবী দুর্ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে মিরপুর বিভাগের ডিসি বলেন, প্রথমে বাদী সাতজনের নাম বলেছিলেন। পরে আরও সাতজনের নাম বলেছেন। পরে নাম জমা দেওয়া সাতজনের কেউ ঘটনায় জড়িত থাকলে নিয়ম অনুযায়ী এজাহারভুক্ত করা হবে। লিখিত অভিযোগের পরদিন গতকাল রাতে গোলাম নবীকে প্রত্যাহার করা হয়। আসামিদের হুমকি: নাসিরের ভাই মোশারফ বলেন, গত রোববার রাতে ভাষানটেকের দেওয়ান পাড়ার তাঁর বোনের বাসায় গিয়ে কয়েকজন আসামি হুমকি দিয়েছেন। এখানে নাসির থাকতেন। এ কারণে ভয়ে-আতঙ্কে তাঁদের অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। মোশারফ বলেন, আসামিরা পুলিশের ওপর হামলা করেও এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছে। পুলিশের সঙ্গে তাদের সখ্য। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলেও তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। তার ভাই হত্যার পরও তারা হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। অথচ পুলিশ এখন তাদের গ্রেপ্তার করছে না। ভাই হত্যার সুষ্ঠু বিচার পাবেন কি না, তা নিয়ে সংশয়ে আছেন তাঁরা। তবে মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা ভাষানটেক থানার এসআই জহির প্রথম আলোকে বলেন, হুমকি নয়, নিরাপত্তার কথা ভেবে নাসিরের বোনের পরিবারকে অন্যত্র পাঠানো হয়েছে। আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানান তিনি।
No comments:
Post a Comment