Monday, January 26, 2015

যাত্রাবাড়ীতে ব্যাপক অভিযান, বনশ্রীতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ২:প্রথম অালো

যাত্রাবাড়ীতে চলন্ত বাসে পেট্রলবোমা হামলার ঘটনায় শনিবার রাতে ঘটনাস্থলের আশপাশে প্রায় ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়েছে। এ অভিযানে অন্তত ৩০ জনকে গ্রেপ্তারের কথা স্বীকার করেছে পুলিশ। একই রাতে রাজধানীর বনশ্রীতে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে দুজন নিহত হয়েছেন। গতকাল রাত পর্যন্ত এ দুজনের কোনো পরিচয় মেলেনি। মৃতদেহ দুটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পড়ে আছে
। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের টানা অবরোধ চলাকালে ১৬ জানুয়ারি থেকে কথিত বন্দুকযুদ্ধে এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ছয়। এঁদের চারজন নিহত হয়েছেন রাজধানীতে। গত শুক্রবার রাতে যাত্রাবাড়ীর কাঠেরপুল এলাকায় বাসে পেট্রলবোমা হামলায় ২৯ জন দগ্ধ হওয়ার পর বিএনপির নেতাদের আসামি করে থানায় দুটি মামলা করে পুলিশ। ওই মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করা হয়। পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মোশতাক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী ও ডেমরা এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে থানার পুলিশের সঙ্গে বিজিবি ও র্যাবের সদস্যরা অংশ নেন। এতে ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, যাত্রাবাড়ী ও কদমতলী থানা এলাকার প্রায় পুরোটা এবং ডেমরা থানার কিছু অংশজুড়ে অভিযান চালানো হয়। নামের তালিকা ধরে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বাসায় বাসায় গিয়ে তল্লাশি করে পুলিশ। অন্তত ১০০ বাসাবাড়ি ও মেসে অভিযান চালানো হয়। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে দনিয়ার এ কে হাইস্কুলের অধ্যক্ষ ও জাতীয়তাবাদী শিক্ষক সমিতির সভাপতি সেলিম ভূঁইয়াও আছেন। তাঁকে ১৪ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ জানায়, ওই থানা এলাকায় ১৮২টি মাদ্রাসা রয়েছে। এসব মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের কেউ কেউ জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁরাই বিভিন্ন সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নাশকতা করছেন বলে অভিযোগ আছে। এসব কারণে যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় চেষ্টা করা সত্ত্বেও নাশকতা থামানো যাচ্ছে না। শনিবার তালিকা ধরে কিছু মেসে অভিযান চালানো হলেও বেশির ভাগ সন্দেহভাজনকেই পাওয়া যায়নি। কদমতলী থানার পুলিশ জানায়, শনিবার ওই এলাকার ১০টি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর লালমাটিয়া এলাকা থেকে গতকাল সকালে শিবিরের দুই কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে মোহাম্মদপুর থানার পুলিশ। এঁরা হলেন মো. হাসিব ও মো. ইস্রাফিল। তাঁদের কাছ থেকে ছাত্রশিবিরের একটি ব্যানার উদ্ধার করা হয়। তাঁরা নাশকতার জন্য ব্যানারসহ লালমাটিয়া এলাকায় জড়ো হচ্ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ ছাড়া গতকাল বেলা ১১টার দিকে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ থেকে মোহাম্মদপুর থানা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক আলী কায়সার ওরফে পিন্টুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ‘বন্দুকযুদ্ধ’: ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, গতকাল ভোর পাঁচটার দিকে দুজনকে হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসক তাঁদের মৃত ঘোষণা করেন। বনশ্রীতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে তাঁরা নিহত হন। এঁদের একজনের বয়স আনুমানিক ৪০ বছর, অপরজনের ৩৫। দুপুর ১২টায় লাশের সুরতহাল করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারাওয়াত মেহজাবিন। সুরতহালে বলা হয়, আনুমানিক ৪০ বছর বয়সী লোকটির শরীরে ১৬টি গুলির চিহ্ন রয়েছে। এর মধ্যে বুকের ডান পাশে দুটি, বাঁ পাশে একটি, পেটের বিভিন্ন অংশে সাতটি, কোমরের আশপাশে পাঁচটি গুলির চিহ্ন রয়েছে। তাঁর বাঁ হাতের ওপরের অংশে গুলি ভেদ করে বের হয়ে গেছে। অপরজনের পরনে ছিল চেক শার্ট, জিনস ও জ্যাকেট। সুরতহালে তাঁর বুকের ডান দিকে একটি, বাঁ পাশে দুটি, বগলের নিচে একটি, পিঠের ওপরের অংশের বাঁ পাশে দুটি ও ডান পাশে একটি গুলির চিহ্ন রয়েছে। র্যাব জানায়, বনশ্রীতে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনাস্থল থেকে একটি টয়োটা এক্স করোলা গাড়ি, ম্যাগাজিনসহ দুটি বিদেশি পিস্তল, ছয়টি গুলি, এক জোড়া হাতকড়া, একটি ওয়াকিটকি, দুটি ডিবি লেখা জ্যাকেট ও একটি পিস্তলের কভার উদ্ধার করা হয়েছে। ওই গাড়ির ভেতর থেকে ‘নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়’ লেখা কাগজের বোর্ড উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁরা ডিবি পরিচয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ছিলেন বলে র্যাবের কর্মকর্তাদের ধারণা। তবে তাঁদের পরিচয় পাওয়া যায়নি। র্যাব-৩-এর পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার গোলাম সারোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, শনিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে র্যাব-৩-এর একটি দল রামপুরার বনশ্রীতে চৌকি বসিয়ে তল্লাশি করছিল। এ সময় সেখানে রুপালি রঙের একটি গাড়ি এলে র্যাবের সদস্যরা সংকেত দিয়ে থামান। গাড়িতে চালকসহ তিনজন ছিলেন। র্যাবের সদস্যরা গাড়িতে তল্লাশি করতে গেলে পেছনের আসনে থাকা লোকটি গুলি করে দরজা খুলে রামপুরা খালের দিকে দৌড় দেন। চালকের পাশে থাকা লোকটিও একই দিকে দৌড় দেন। র্যাব পাল্টা গুলি চালালে ওই দুজনই গুলিবিদ্ধ হন। গোলাগুলি শুরু হলে চালক র্যাবের এক সদস্যকে ধাক্কা দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যান। পরে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। খন্দকার গোলাম সারোয়ার বলেন, গাড়িতে চালকের পাশের আসনে বসা লোকটির কাছে আরেকটি পিস্তল ছিল। তবে তিনি সেটি ব্যবহার করেননি। পিস্তলটি আসনের নিচে পাওয়া গেছে। পেছনের আসনের লোকটি শুধু পিস্তল ব্যবহার করেন। র্যাব-৩-এর পরিচালক বলেন, নিহত ব্যক্তিদের ব্যবহৃত গাড়িটির মালিকের পরিচয় পাওয়া গেছে। গাড়িটির মালিক নাসিরউদ্দিন মোল্লা ‘রেন্ট-এ কারের’ ব্যবসা করেন। গত ২১ ডিসেম্বর গাড়িটি চুরি হওয়ার অভিযোগে তিনি কলাবাগান থানায় মামলা করেছেন। এজাহারে বলা হয়, মিজান নামের এক চালক গাড়িটি নিয়ে ‘ট্রিপ’ মারতে বের হওয়ার পরে আর ফেরেননি। বনশ্রীর একজন বাসিন্দা প্রথম আলোকে জানান, শনিবার গভীর রাতে বনশ্রী আইডিয়াল স্কুলের সামনে প্রধান সড়কের দিকে অন্তত ৩০টি গুলির শব্দ শুনেছেন। সেখানে চারটির মতো র্যাব-৩-এর গাড়ি ছিল। এর বাইরে সেখানে কী ঘটেছে, তা তাঁরা দেখতে পাননি। এ বিষয়ে রামপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুবুর রহমান তরফদার বলেন, র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে দুজন নিহত হয়েছেন। তবে তাঁদের পরিচয় জানা যায়নি। এর আগে ১৯ জানুয়ারি গভীর রাতে নিহত হন খিলগাঁও থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান ওরফে জনি (৩০) এবং ১৮ জানুয়ারি গভীর রাতে নড়াইল পৌরসভার কাউন্সিলর ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা ইমরুল কায়েস (৩২)। ডিবি পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে তাঁরা মারা যান। এর মধ্যে মতিঝিলে ইমরুল এবং খিলগাঁওয়ের তিলপাপাড়া জোড়পুকুর খেলার মাঠের কাছে নুরুজ্জামান নিহত হন। র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ২২ জানুয়ারি গভীর রাতে কুমিল্লার দাউদকান্দির পুটিয়ায় লক্ষ্মীপুরের ছাত্রদলের সাবেক নেতা সোলাইমান উদ্দিন জিসান (৪০) এবং ১৬ জানুয়ারি গভীর রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাটে স্থানীয় ছাত্রদলের নেতা মতিউর রহমান (২২) নিহত হন।

No comments:

Post a Comment