শান্ত, ঋজু ভঙ্গিতে হেঁটে চলেছেন তিনি। অদূরেই কান উৎসবের লালগালিচার জৌলুশ বা পথচলতি মানুষজনের কৌতূহলী দৃষ্টি—কোনো কিছুই যেন স্পর্শ করছে না তাঁকে। ভিড়ের মধ্যে কালো এই মানুষটা আশ্চর্য রকমের আলাদা। তিনি আবদের রাহমানে সিসাকো। আগের দিনই জেনেছি, এবারের কান চলচ্চিত্র উৎসবে ফ্রান্সের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সম্মাননা পেতে চলেছেন এই আফ্রিকান নির্মাতা। এবারে ৬৮তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি বিভাগের বিচারকদের সভাপতির দায়িত্বও তাঁর কাঁধে। আফ্রিকার যে গুটিকয়েক নির্মাতা এই সময়ে বিশ্বজুড়ে খ্যাতিমান ও প্রভাবশালী, সিসাকো তাঁদের একজন। গেল বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবে সাড়া ফেলেছিল তাঁর ছবি টিম্বাকটু। একই বছরে ভিনদেশি ভাষার ছবি বিভাগে অস্কার মনোনয়ন পায় মালি-ফ্রান্স যৌথ প্রযোজনার এই ছবি। তবে আফ্রিকার চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ওসমান সেমবেনের যোগ্য এই উত্তরসূরি বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলেছিলেন, তবে টিম্বাকটু নির্মাণেরও বেশ আগে। ২০০২ সালে তাঁর ছবি ওয়েটিং ফর হ্যাপিনেস জিতেছিল ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফিল্ম ক্রিটিকস বা ফিপ্রেসকি পুরস্কার। পরের ছবি বামাকোও নজর কেড়েছিল সবার। এমন একজন মানুষের সঙ্গে আলাপের সুযোগ হাতছাড়া করার কোনো মানে হয় না। মওকা পেয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে ভয়ে ভয়ে বললাম, ‘আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি।’ হন্টনরত মুনির ধ্যানভঙ্গ হলো যেন, ‘ওহ্, বাংলাদেশ থেকে? বেশ তো।’ বলেই ঝকমকে সাদা দাঁতের পাটি বের করে হাসলেন একটুখানি। টিম্বাকটু ছবির কাহিনিই বলে দেবে, সিসাকোর এই হাসির আসলে অন্য মানে হতে পারে। ধর্মীয় বিধিনিষেধের বেড়াজালে বন্দী একটা সমাজের পটভূমিতে তৈরি টিম্বাকটু। যার পুরোটাজুড়ে আছে আফ্রিকার দারিদ্র্যপীড়িত গরিব মানুষ। ‘আপনার টিম্বাকটু খুব ভালো লেগেছে। বিচারক, নাকি প্রতিযোগী—কোন জায়গায় নিজেকে দেখতে ভালো লাগে?’ হাঁটতে হাঁটতে সিসাকোর জবাব, ‘জানি না। বিচারক তো আমি একা নই। আরও বেশ কয়েকজন আছেন আমার সঙ্গে।’ ‘আজ ফরাসি সরকারের বিশেষ সম্মাননা পাচ্ছেন আপনি। আপনার অনুভূতি কী?’ শুরুতে কোনো জবাব নেই। আশপাশ থেকে মানুষজন তাঁকে ঘিরে ধরতে শুরু করেছেন। তাঁদের এড়াতে সিসাকো পা ফেলছেন এখন হনহন করে। তাল মেলাতে রীতিমতো ছুটতে হচ্ছে। বেশ খানিকক্ষণ পেছন পেছন যাওয়ার পর অবশেষে উত্তর মিলল। ‘হুম্। হ্যাঁ, তাই তো। আজ বিকেলেই তো (১৫ মে) অনুষ্ঠান।’ আলাপ বলতে এতটুকুই। সিসাকোর হাতে ফোন। খুব সম্ভবত জরুরি। নিরাপত্তাবেষ্টনী পার হয়ে তিনি চলে গেলেন ভেতরে। ম্যাথ্যু ম্যাককনির বিপত্তি সি অব ট্রিজ চলচ্চিত্রটি ঘিরে বাড়তি আগ্রহ ছিল আগে থেকেই। সালে দিবুসি হলের সামনে গিয়ে বুঝলাম, সেই আগ্রহ কতটা। সাংবাদিক-সমালোচকদের এত লম্বা লাইন চোখে পড়েনি আগে। ম্যাথ্যু ম্যাককনির ছবি বলে কথা। সঙ্গে আবার আছেন অভিনেত্রী নাওমি ওয়াটস। পরিচালকের নাম কিনা আবার গাস ভ্যান সান্ট। সব মিলিয়ে সি অব ট্রিজ ছিল উৎসবের বহুল প্রতীক্ষিত ছবির তালিকায়। কিন্তু প্রথম দেখায় বেশির ভাগ দর্শককে হতাশই করেছে এই ছবি। ম্যাথ্যু ম্যাককনির জন্য কিছুটা বিপত্তি তো বটেই। এ ছাড়া গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে নান্নি মোরেত্তির মিয়া মাদরে বা মাই মাদার ছবির উদ্বোধনী প্রদর্শনী ছিল গতকাল। কান উৎসবে চতুর্থ দিনের সকালটা সরগরম রেখেছিলেন ছবিটির কলাকুশলীরা। ধ্রুপদি ছবি বিভাগে ছিল অরসন ওয়েলসের দ্য লেডি ফ্রম সাংহাই ছবির প্রদর্শনী।
No comments:
Post a Comment