Tuesday, August 19, 2014

সম্পর্ক জোরদারে ভারতকে উদার হতে হবে:প্রথম অালো

ভারতের নরেন্দ্র মোদির সরকার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের নীতিতে প্রাধান্য দিচ্ছে। দুই নিকট প্রতিবেশীর সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের অনুপ্রবেশ’-এর মতো বিষয়গুলোতে অবস্থান স্পষ্ট করে আস্থা জোরদার করতে হবে। আর অমীমাংসিত সমস্যাগুলো দূর করার মাধ্যমে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য ভারতকে উদারভাবে এগিয়ে আসতে হবে। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনা
ল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) আয়োজনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কবিষয়ক এক সেমিনারে বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। বিস মিলনায়তনে ‘কনটেম্পরারি থটস অন বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া রিলেশনস: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অপরচুনিটিস’ শীর্ষক এই সেমিনারে তিনটি অধিবেশনে বক্তারা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। উদ্বোধনী অধিবেশনে বিসের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি মুন্সি ফয়েজ আহমদের সঞ্চালনায় দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট অব এশিয়ান স্টাডিজের (এমএকেএআইএএস) চেয়ারম্যান সীতারাম শর্মা এবং বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক শাহাব এনাম খান। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বিসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এস এম সফিউদ্দিন আহমেদ। সীতারাম শর্মা বলেন, ক্ষমতায় কোন দল আছে, সেটার ওপর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নির্ভর করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই বাংলাদেশে, বিশেষ করে এখানকার সামরিক বলয়ে কিছুটা হলেও ভারতবিরোধী মনোভাব রয়েছে। তবে বাংলাদেশ-ভারত দুই পক্ষই বুঝতে পেরেছে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অচলাবস্থা থাকলে তা কারও জন্য সুখকর নয়। যেহেতু এই উপমহাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অভিন্ন, তাই বাংলাদেশের জন্য বাজার উন্মুক্ত করার ব্যাপারে ভারতকে উদারতার পরিচয় দিতে হবে। তবে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব থাকার ব্যাপারে সীতারাম শর্মার বক্তব্যের বিরোধিতা করেন নির্ধারিত আলোচক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, এ ধরনের ‘তকমা লাগানো’ কিংবা ঢালাও মন্তব্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সহায়ক নয়। এটাই যদি বাস্তবতা হতো, গত ছয় বছরে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক বিশেষ পর্যায়ে উন্নীত হতো না। পরে অবশ্য সীতারাম শর্মা বলেন, বাংলাদেশের সব দলই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে আগ্রহী। মেজর জেনারেল এস এম সফিউদ্দিন আহমেদের সঞ্চালনায় দ্বিতীয় অধিবেশনে দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এমএকেএআইএএসের ডিরেক্টর শ্রীরাধা দত্ত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ। শ্রীরাধা দত্ত তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন এবং অসম বাণিজ্যবৈষম্য বিলোপ বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়। অথচ দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, আমাদের পক্ষ থেকে এসব উদ্বেগ দূর করা হয়নি। অথচ চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের বিপুল বৈষম্য থাকলেও অন্য বিষয়গুলো সুরাহায় বেইজিং সচেষ্ট আছে। অথচ ভারত কখনো এভাবে বিষয়গুলোকে বিবেচনা করেনি।’ সীমান্ত হত্যার প্রসঙ্গ টেনে ভারতের লজ্জিত হওয়া উচিত বলে তিনি মত দেন। পাশাপাশি সন্ধ্যার পর অবৈধ তৎপরতায় যুক্ত লোকজনের সীমান্ত পারাপারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। তাঁর মতে, সন্ধ্যার পর থেকে সীমান্ত এলাকায় লোকজনের চলাচল বন্ধের ব্যাপারে দুই পক্ষের আলোচনা হওয়া উচিত। দ্বিতীয় অধিবেশনে নির্ধারিত আলোচক ছিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরী। তিনি বলেন, গণমাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সংবাদ প্রচারের ব্যাপারে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তফাতটা খুব স্পষ্ট। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ভারতের বিষয়গুলো যতটা গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ পায়, ঠিক উল্টো হয় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতের গণমাধ্যমে। বাংলাদেশের স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর ভারতে সম্প্রচারে বিধিনিষেধ এখনো অব্যাহত রয়েছে। এরপর ভিসা নিয়ে ভোগান্তির বিষয়টি তো রয়েছেই। ভিসা-প্রার্থীরা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সাক্ষাৎকারের জন্য নির্ধারিত ই-টোকেন পান না। এসবের পর বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশীর সীমান্তে যখন লোকজন প্রাণ হারায়, তা এখানকার মানুষের মনে অবশ্যই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শ্রীরাধা দত্তের বক্তব্যের সূত্র ধরে মুক্ত আলোচনা পর্বে সাবেক রাষ্ট্রদূত আশফাকুর রহমান প্রশ্ন করেন, ভারতে বাংলাদেশের নাগরিকদের অবৈধ অনুপ্রবেশ কতটা রাজনৈতিক ভাষ্য আর কতটাই বা বাস্তবতা? অর্থনৈতিক কারণে ভারতের কোন অংশে বাংলাদেশের কত লোক গেছেন? তিনি বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্যি, এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য না থাকলেও ভারতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সংখ্যা উল্লেখ করা হয়। এটি বাংলাদেশের জন্য খুবই বিব্রতকর। অথচ বাংলাদেশেও বিপুলসংখ্যক ভারতীয় অবৈধভাবে কাজ করছেন। প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে ভারতে ৪০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স হিসেবে যাচ্ছে। কাজেই দুই দেশের মধ্যে আস্থা জোরদার করতে হলে এ বিষয়গুলোর সুরাহা হওয়াটা জরুরি। সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফারুক সোবহানের সঞ্চালনায় তৃতীয় অধিবেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী ও বিসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হোসনা শিউলি। নির্ধারিত আলোচক ছিলেন ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (আইসিএলডিএস) নির্বাহী পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মো. আবদুর রশিদ।

No comments:

Post a Comment